ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
কৃষি মন্ত্রণালয়ে মঙ্গলবার আসছেন প্রধানমন্ত্রী
কমছে সারের মজুত, বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কা
✎ তরিকুল ইসলাম সুমন
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩৮ পিএম আপডেট: ২৪.০৮.২০২৬ ৯:২২ পিএম
এ আই
X

এ আই

গ্যাস সংকটের কারণে দেশের সরকারি সাতটি সার কারখানার মধ্যে মাত্র ঘোড়াশাল সার কারখানা সচল রয়েছে। বাকি ৬টি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশের কৃষকদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে এ সমস্যা সরকারের মজুত কমাচ্ছে, অন্যদিকে বোরো মৌসুমে কাঙ্খিত উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অপর্যাপ্ত সারের যোগান থাকায় অনেক ডিলার তাদের জন্য বরাদ্দের সার তুলছেন না। এ কারণে সার সংকট আরো বেড়েছে। যার প্রমাণ কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার না পেয়ে কৃষকরা জোট বেঁধে গুদামের দরজা ভেঙে সারের বস্তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের উন্নয়নে কৃষি মন্ত্রনালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। খাদ্যশষ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাতে পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই রয়েছে তাদের নজরদারি। এ কারণে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষি মন্ত্রনালয় পরিদর্শন করবেন। বসবেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। দিবেন আশুকরনীয় সম্পর্কে দিক নির্দেশনা।  

সরকারের পক্ষ থেকে সার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েও দাম ও সরবরাহে  লাগাম টানতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের সারের এই অবস্থায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দাবি করেছেন এটি একটি ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’। সারের কোনো সংকট না থাকলেও সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে।

জানা গেছে, ইউরিয়া, টিএপি, ডিএপি ও এমওপি সার কেনার ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ৪ টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিতে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) হিসাব করলে ২শ থেকে শুরু করে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষককে। কোনো কোনো জেলায় এর চেয়েও বেশি দামে সার বিক্রির খবর পাওয়া গেছে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক হাবিব বলেন, ‘আমি ৫ বিঘা জমিতে আমন রোপণ করেছি। প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ইউরিয়া ১৫শ টাকা এবং ডিএপি প্রতি বস্তা ১৪শ টাকা দরে কিনেছি। কয়েক দোকান ঘুরে এই দামে সার কিনতে হয়েছে। অথচ সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা। সে অনুযায়ী ইউরিয়াতে বস্তাপ্রতি ১৫০ টাকা বা কেজিতে ৩ টাকা এবং ডিএপিতে বস্তাপ্রতি ৩৫০ টাকা বা কেজিপ্রতি ৭ টাকা বেশি খরচ করতে হয়েছে কৃষককে। এছাড়া সরকার প্রতি বস্তা টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা বা কেজি ২৭ টাকা এবং এমওপি প্রতি বস্তা ১ হাজার টাকা বা প্রতি কেজি ২০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। সারা দেশে নির্ধারিত দামে সার বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

দিনাজপুর সদর উপজেলার কৃষক আকবর আলী বলেন, বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলারের দোকান থেকে সার পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৪০ টাকা কেজি দরে কিনেছি। জমিতে ধান রোপণ করা হচ্ছে। এখন সার ছিটাতে হবে। সময় মতো সার ছিটাতে না পারলে ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা সার ডিলারদের কাছে বারবার গিয়ে ঘুরে আসছি।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু মাঠে খুব বেশি ইতিবাচক ফল নেই। এই বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘সার নিয়ে মাঠে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে, এটা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। গত বছরের চেয়ে বেশি সারের মজুদ আমাদের কাছে আছে। অনেক জায়গায় সরকারি গুদামে সার রাখার জায়গা নেই। সার নিয়ে নতুন একটি নীতিমালা করেছি। সেজন্য যারা বঞ্চিত হবেন বলে মনে করছেন, তারা সমস্যা করছেন। যেহেতু আমাদের কাছে সার আছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনেক ডিলার রয়েছেন যারা বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করেই মাঠে সংকটের কথা বলছেন। অনেকে আবার তাদের বরাদ্দ খুচরা বিক্রেতা বা অন্য কোনো প্রতিনিধির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। কিছু অসাধু ডিলার রয়েছেন যারা সিন্ডিকেট করে মাঠে অস্থিরতা তৈরি করছেন। আওয়ামী লীগ আমলের ডিলারশিপ পাওয়া কিছু ব্যক্তি মনে করছেন তাদের ডিলারশিপ থাকবে না, তারাও এর সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে রয়েছে বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের মধ্যে রেষারেষি। এছাড়া চা বাগানের জন্য বরাদ্দ না থাকলেও নিয়মিত সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে সেখানে সার যাচ্ছে। অনেক কৃষক আছেন যারা শঙ্কা থেকে আগাম আলু চাষের জন্য সার কিনে মজুদ করছেন।

সরকারি নতুন সার নীতিমালার কারণে খুচরা বিক্রেতাদের বাতিল করা হবে বলে যে আলোচনা রয়েছে সেটাও প্রভাব ফেলছে। কিন্তু যাদের লাইসেন্স ঠিক নেই, একজনের লাইসেন্স দিয়ে অন্যজন ব্যবসা করছেন এমন সমস্যাযুক্ত খুচরা বিক্রেতা ছাড়া বাকিদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সারা দেশে এদের নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এসব কারণেই সারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষক অনেক ক্ষেত্রেই ডিলারের কাছে সার কিনতে গেলেই বলা হচ্ছে সার নেই, বরাদ্দ কম। সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বললেও সারা দেশের ডিলাররা বলছেন, তাদের বরাদ্দ কম দেওয়া হচ্ছে। অথচ সরকার সারের বরাদ্দ বছরের শুরুতেই নির্ধারণ করে এবং সে অনুযায়ী প্রতি মাসেই সার বরাদ্দ হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সার ডিলার শামসুল ইসলাম বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া যাচ্ছে। বস্তায় সরকারি মূল্য লিখা রয়েছে, ফলে বেশি দামে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই। একই অভিযোগ করেন ময়মনসিংহ জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাবুল। তিনিও বলেন, সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম।

এদিকে সারা দেশের কিছু কিছু ডিলার সারের বাজারে অস্থিরতা তৈরি বা বাড়তি দাম নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন তার একটি প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) এক জরুরি সতর্কীকরণ চিঠি থেকে। এতে বলা হয়েছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে যা অনাকাঙ্খিত। ডিলারশিপ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার স্বার্থে তাদের নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করতে সতর্ক করা হয়েছে।বিএফএ চেয়ারম্যানের দেওয়া এই চিঠিতে বলা হয়েছে, জেলাগুলোতে ডিলার বা খুচরা বিক্রেতারা যাতে বেশি দাম না নিতে পারেন সেজন্য প্রতিটি জেলা কমিটিকে নজরদারি করতে বলা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা গেছে, চলতি মাসের ৯ তারিখ পর্যন্ত সরকারের কাছে ৫ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৫৩ হাজার মে.টন টিএসপি, ৩ লাখ ৯০ হাজার মে.টন ডিএপি এবং ১ লাখ ৯৬ হাজার মে.টন এমওপি সারের মজুদ রয়েছে।

ইতোমধ্যে গত ১৯ আগস্ট সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আরব আমিরাত থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন ইউরিয়া কেনার অনুমদি দিয়েছে। অপরদিকে কানাডা, রাশিয়া এবং সৌদি আরব থেকে এক লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির তিনটি প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, নিরাপত্তা মজুদ না থাকলেও সরকারের কাছে যা সার রয়েছে তাতে করে আমন মৌসুমে কোনো সংকট তৈরি হবে না। তবে বোরো মৌসুমে এটা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা কাটানোর মতো সারের মজুদ এখনো সরকারের কাছে নেই।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেন, ‘নতুন নীতিমালা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাড়ানো হচ্ছে। যা মাঠে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। ডিলারদের মধ্যে কিছু সমস্যা রয়েছে এগুলো আমরা মনিটরিং করেছি। এছাড়া গতকাল ৬৪ জেলার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেছি। তাদের মনিটরিংয়ে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক করা হয়েছে। যেসব ডিলার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছেন তাদের অনেকের লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে এবং সামনে যারা চিহ্নিত হবেন তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না।’

মূলত সারা দেশে সার নিয়ে সংকটটা তীব্র হয়েছে সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫’ জারি করার পর থেকে। এই নীতিমালায় সারা দেশে সারের খুচরা বিক্রেতার বিধান তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে করে ৪৪ হাজারের মতো বিক্রেতা বিক্ষুব্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করেছেন। অন্যদিকে একজন ডিলারের তিনটি করে বিক্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হবে যেখানে দুটিতে বিক্রয় প্রতিনিধি দেবে সংশ্লিষ্ট ডিলার। এতে একজন ডিলারের ব্যয় বেড়ে গেলেও বাড়ানো হয়নি কমিশনের পরিমাণ। আবার নতুন করে ডিলারশিপ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ায় সারা দেশে অনেকের ডিলারশিপ বাতিল হয়ে যাচ্ছে বলেও গুজব রয়েছে। এসব ডিলার আবার বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় বলে দিচ্ছেন সারের বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না, সার নেই। সব মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থিরতা। যার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ কৃষক, চড়া দাম দিয়েও সার কিনতে পারছেন না।

টিএস
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝