তেলের দামের ব্যাপক উত্থানের পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনার বিস্তারিত ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতার লক্ষণ নেই। এ অবস্থায় সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দিতে সংবাদ সম্মেলন করার কথা ছিল।
বেসেন্ট ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এ লিখেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে ‘কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান’ শুরু করছে। তিনি এই পদক্ষেপককে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রধান দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় দুই শতাংশ কমেছে। তবে গত সপ্তাহে সাত শতাংশের বেশি বাড়ার পরও ব্রেন্ট ক্রডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯২ ডলারের ওপরে রয়েছে।
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই এবং অঞ্চল থেকে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র কৌশল পরিবর্তন করছে।
তিনি বলেন, সামরিক হামলার হুমকি থেকে ‘সুপার নিষেধাজ্ঞার’ দিকে সরে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত কোনো শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে এখনো বাজারে আস্থা তৈরি হয়নি। ইউরোপের বাজারের মধ্যে লন্ডন সামান্য ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও ফ্রাঙ্কফুর্ট ও প্যারিসের বাজার ছিল প্রায় অপরিবর্তিত।
এদিকে এশিয়ার শেয়ারবাজারে প্রযুক্তি খাতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এখন মার্কিন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া আয়ের প্রতিবেদনের দিকে বিনিয়োগকারীদের নজর । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে এনভিডিয়ার ফলাফলকে পুরো প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ প্রবণতার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনভিডিয়ার সামনে মূল প্রশ্ন হলো এআইয়ের উত্থান কি আরও দ্রুত গতিতে অব্যাহত থাকবে এবং প্রযুক্তিটি বিশ্ব অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটবে।
এক্সটিবির গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকস বলেন, এনভিডিয়ার ফলাফল থেকে এআই অবকাঠামোর চাহিদা, চীনা প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় কোম্পানিটির কৌশল এবং প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যাবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর কসপি সূচক ৩ শতাংশের বেশি কমেছে । স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন সূচকটির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করে। টোকিও ও সাংহাইয়ের বাজারও নিম্নমুখী ছিল।
হংকংয়ের শেয়ারবাজারও প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যেই ফাস্ট ফ্যাশন জায়ান্ট শেইন ঘোষণা করেছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর চীনের এই আর্থিক কেন্দ্রে তাদের বহুল প্রত্যাশিত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি হবে। তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির মূল্য প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি হতে পারে।
চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবাও বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এআই-সংক্রান্ত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় অর্থায়নের জন্য হংকংয়ে প্রায় এক হাজার বিশ কোটি ডলারের নতুন শেয়ার ইস্যু করবে। এদিকে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যাকসন হোলে অনুষ্ঠিতব্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের বার্ষিক সম্মেলনের দিকেও নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার আশা করছেন।
এই বৈঠকের আগে মার্কিন ট্রেজারি জানিয়েছে, তারা নিজেদের আরও সরকারি বন্ড পুনঃক্রয় করবে। এর লক্ষ্য হলো ঋণের ব্যয় কমানো। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে, যে সময়ের পরপরই বৈশ্বিক আর্থিক সংকট শুরু হয়েছিল।
মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর বেশ কয়েকটির সরকারি বন্ডের সুদহারও বেড়েছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দেশটির ফেডারেল ঋণ চল্লিশ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে ।
মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে কানাডীয় ডলারের দাম ০.৫ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর গত এক মাস ধরেই কানাডীয় মুদ্রাটির দরপতন অব্যাহত রয়েছে।
আইএনজির বিশ্লেষকেরা বলেন, তুলনামূলক ছোট ও উন্মুক্ত অর্থনীতি হওয়ায় নতুন মার্কিন শুল্কের প্রভাবে কানাডায় ক্ষতির ঝুঁকি বেশি। তবে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলোকে সহায়তা করতে আরও সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
রয়টার্স/ এফএস