উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট। শরীরের প্রায় সব অঙ্গই অকার্যকর। বিছানায় শুয়ে কেটে গেছে ২১ বছর। অর্থসংকটে করাতে পারেননি উন্নত চিকিৎসা। জন্মগত প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের বাঁশতলা এলাকার আবজাল শেখ ও মর্জিনা বেগম দম্পতি।
তাদের মেয়ে তুলি। বয়স বাড়লেও তার শারীরিক বৃদ্ধি হয়নি। জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা তুলির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে অন্যের ওপর নির্ভর করে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে মোংলা উপজেলার বাঁশতলা বাজারসংলগ্ন আবজাল শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ২১ বছর বয়সী তুলিকে কোলে বসিয়ে পুকুরঘাটে মুখ ধুয়ে দিচ্ছেন তার মা মর্জিনা বেগম।
এ সময় মেয়ে তুলির বিষয়ে জানতে চাইলে মর্জিনা বেগম জানান, জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দিন কথা বলতে পারেনি তার মেয়ে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, এমনকি বসতেও পারে না। শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গই অকার্যকর। ক্ষুধা পেলেও সে তা বলতে পারে না। বিছানায় শুয়েই কেটেছে তুলির ২১ বছর।
মর্জিনা বেগম বলেন, “এর মধ্যে মোংলা ও খুলনায় অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু মেয়ের কোনো পরিবর্তন হয়নি। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসাও করাতে পারিনি। এখন আমাদের বয়স হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তুলির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা জানি না।”
তুলির বাবা আবজাল শেখ জানান, জেলে পেশা থেকে তিনি যে আয় করেন, নিজেদের খেয়ে না-খেয়ে সেই আয়ের অধিকাংশই মেয়ের চিকিৎসা ও দেখাশোনার পেছনে ব্যয় করেছেন।
তিনি বলেন, “খুলনার একজন চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছেন, তুলিকে ভারতে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর জন্য। কিন্তু অর্থের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ২১ বছরেও তুলির কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় আমি হতাশ হয়ে পড়েছি।”
আবজাল শেখ আরও বলেন, “আমার বয়স হয়েছে। নানা রোগে ভুগছি। এখন আর মাছ ধরতে নদীতে নামতে পারি না। তুলি ছাড়াও আমার আরও দুই সন্তান রয়েছে। এখন পরিবারের সবার খাবারই ঠিকমতো জোগাড় করতে পারি না। কী দিয়ে প্রতিবন্ধী মেয়ের চিকিৎসা করাব? আমি যদি মারা যাই, তাহলে প্রতিবন্ধী মেয়েটি কার কাছে বা কীভাবে থাকবে?”
এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
আবজাল শেখের প্রতিবেশী নুর মোহাম্মদ বলেন, “আমরা অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ দেখেছি। কেউ বাক্প্রতিবন্ধী, কেউ বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, আবার কেউ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। কিন্তু আবজাল শেখের মেয়ের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। তাকে নিয়ে পরিবারটি খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে। কখনো খেয়ে, আবার কখনো না খেয়ে তাদের দিন কাটছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা খান আশিকুজ্জামান বলেন, “মর্জিনা বেগমের মেয়ে তুলিকে দেখলে আমাদেরও খুব কষ্ট হয়। মেয়েটির শারীরিক গঠন স্বাভাবিক নয়। তার শরীরের কোনো অঙ্গই পূর্ণতা পায়নি। সারা দিন মেয়েকে নিয়েই কাটে মর্জিনা বেগমের।”
তিনি আরও বলেন, “মেয়ের চিকিৎসা ও নিজেদের ভরণপোষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি।”
মোংলা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানান, তুলির শারীরিক অবস্থা দেখার পর সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে শুধু ওই ভাতা দিয়ে তার ভরণপোষণ ও চিকিৎসা চালানো সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধী তুলি ও তার পরিবারকে সহায়তা করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবন্ধী তুলি একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে—এখনো এমন বুকভরা আশা তার বাবা-মায়ের। তাই মেয়ের চিকিৎসা ও পরিবারের সহায়তায় সরকার এবং সমাজের বিত্তবানদের কাছে তাদের আকুতি—তুলির পাশে দাঁড়ান, একটু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিন।
জেইউ/আরএন