রাজধানী ঢাকায় এক দিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাত যেন নগরজীবনের দুর্বল ব্যবস্থাপনার চিত্র আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টির পর নগরীর বিভিন্ন সড়কে সৃষ্টি হয় ব্যাপক জলাবদ্ধতা। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও যান চলাচলে স্থবিরতা—এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দোকানপাট, মার্কেট, অফিস ও সেবা খাত। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, একদিনের এই জলাবদ্ধতায় ঢাকার অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা।
নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, পান্থপথ, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়াসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে বিপুল পরিমাণ মালামাল। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতেই পারেনি। কর্মীরা সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় ব্যাহত হয়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। একই সঙ্গে ডেলিভারি সার্ভিসসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে সমস্যায় পড়ে।
বেচাকেনায় বড় ধাক্কা
এক দিনের ভারী বর্ষণে ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির নির্দিষ্ট হিসাব এখনো তৈরি হয়নি। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষতির পরিমাণ ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, বৃষ্টির পানিতে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটের মালামাল নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তার মতে, এই ক্ষতির প্রভাব আরও এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। রাস্তাঘাটের দুরবস্থা, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি এবং উন্নয়নকাজে সমন্বয়হীনতার কারণে মানুষের চলাচল ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু এই বৃষ্টিতেই ব্যবসায়ীদের আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
দোকান খুলতে পারেননি ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান টিপু জানান, এক দিনের ভারী বৃষ্টিতে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ক্রেতারা মার্কেটে আসতে পারেননি, আবার অনেক দোকানদারও জলাবদ্ধতার কারণে দোকান খুলতে পারেননি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরো দিন কোনো বেচাকেনাই হয়নি।
তার মতে, অনেক মার্কেটে কর্মচারীরা কাজে আসতে পারেননি। কোথাও ৩০০ দোকানের মার্কেটে মাত্র ৩০টির মতো দোকান খুলেছে। রাস্তার পাশের দোকানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ সরাসরি পানি প্রবেশ করে মালামাল নষ্ট হয়েছে।
বিশেষ করে কাপড়ের দোকানগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। পানি ঢুকে কাপড় ভিজে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী এখন ফ্যান চালিয়ে মালামাল শুকানোর চেষ্টা করছেন। তবে পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে শুকানোর সুযোগও মিলছে না।
আরিফুর রহমান টিপু বলেন, জলাবদ্ধতা ও ভারী বৃষ্টির কারণে ঢাকায় প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা এবং সারাদেশে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি
শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতিই নয়, ঢাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের ‘ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্স অব গ্রেটার ঢাকা এরিয়া’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০১৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই ক্ষতি ১৩ হাজার ৯০০ কোটি থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে।
সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ভারী বর্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে দেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য ও বাণিজ্য খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তিনি জানান, চট্টগ্রামে এরই মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং বন্দরের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। একইভাবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তাসকীন আহমেদ বলেন, দ্রুত কার্যকর নগর পরিকল্পনা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে।
নগর ব্যবস্থাপনার বড় পরীক্ষা
ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন শুধু নাগরিক দুর্ভোগ নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক দিনের বৃষ্টিতেই যেখানে শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অভাবে ভবিষ্যতে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, দ্রুত পরিকল্পিত পদক্ষেপ না নিলে ঢাকার জলাবদ্ধতা নগরের অর্থনৈতিক গতিকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত করবে।