চলতি বছর রেকর্ড শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ বন্যা, খরা, রোগব্যাধির বিস্তার এবং খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)।
সংস্থাটির মতে, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দেশের অনেকগুলোই ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত ও মানবিক সংকটে বিপর্যস্ত।
আইআরসির জরুরি কার্যক্রম বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বব কিচেন বলেন, একের পর এক সংকট একসঙ্গে আঘাত হানছে। অথচ যেসব দেশের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা সবচেয়ে কম, তারাই এবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার (সিপিসি) জানিয়েছে, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হওয়ার সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে।
এদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বলেছে, এল নিনো ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে আরও শক্তিশালী হবে। জলবায়ু বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সুইনের মতে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা এ সময়ের জন্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যার প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রার স্বাভাবিক পরিবর্তন, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর ঘটে। এর ফলে বিশ্বের কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও খরার সৃষ্টি হয়।
পূর্ব আফ্রিকায় এল নিনোর কারণে বছরের শেষ দিকে সাধারণত ভারী বৃষ্টিপাত হয়। এবার ভারত মহাসাগরের উষ্ণ পানির প্রভাবও এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুতে ইতোমধ্যেই কয়েক দফা ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। আগাম সতর্কীকরণ সংস্থা এফইডব্লিউএস নেট জানিয়েছে, বছরের শেষ দিকে ১৯৯৭ বা ২০২৩ সালের মতো বড় বন্যা হলে দক্ষিণ সোমালিয়ায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। এতে কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেনিয়ার আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছরজুড়ে এল নিনো অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ৮০ থেকে ৮২ শতাংশ। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটি ইতোমধ্যে জাতীয় প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করেছে।
বাংলাদেশেও এর প্রভাবের আভাস মিলছে। জুলাইয়ের শুরু থেকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এতে লাখো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের কারণে খরার আশঙ্কা দেখা দিলেও উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ গলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনো পূর্ণ শক্তিতে আঘাত হানলে দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ধানের উৎপাদন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হবে এবং কোটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহেও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সারের দাম বাড়তে পারে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপণ্যের দামে নতুন চাপ তৈরি করবে।
এ পরিস্থিতিতে আইআরসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা দাতা দেশগুলোর প্রতি আগাম অর্থায়ন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার পর ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার চেয়ে আগেভাগে প্রস্তুতি নিলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
-টিএস