ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
অবৈধ ড্রেজারের দাপটে আড়িয়াল খাঁর ভয়াল ভাঙন
✎ আবুল হাসান সোহেল
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৯ পিএম
X

একসময় যেখানে ছিল বসতভিটা, ফসলি জমি আর স্বচ্ছল জীবন, সেখানে এখন শুধু নদীর গর্জন। মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ নদীর ভয়াবহ ভাঙনে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক স্থাপনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ অভিযোগ সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী অস্বীকার করেছেন।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া, চরহোগলপাতিয়া, কালকিনি উপজেলার চর কালকিনি, সস্তাল ও কাদের আকন কান্দিসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙন এখন নিত্যদিনের আতঙ্ক। অনেক পরিবার একাধিকবার বসতভিটা সরিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. এনামুল আকন (৪৮) বলেন, একসময় প্রায় ১০ বিঘা জমিতে কৃষিকাজ করতেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে ধীরে ধীরে নদী তার জমি গ্রাস করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত বসতভিটাসহ পারিবারিক দুই বিঘা জমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে পরিবার নিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

এনামুল আকনের ভাষ্য, "যদি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন না হতো, তাহলে এভাবে নদী ভাঙত না। প্রতিবাদ করতে গেলেও ভয় থাকে।"

একই গ্রামের টিটল আকন জানান, নদীভাঙনে তার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। বর্তমানে নদীর অপর পাশে সামান্য জমিতে নতুন করে বসতি গড়েছেন। তার দাবি, এলাকায় ড্রেজারে বালু উত্তোলন শুরুর পর থেকেই ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, আবাদি জমি, মসজিদ, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চরহোগলপাতিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক স্থাপনা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, নদীভাঙনের কারণে নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে তাদের ভয় লাগে। অনেক সময় এ কারণে বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দা জলিল বেপারী বলেন, "রাতভর ড্রেজারের শব্দে ঘুমাতে পারি না। কিছু বলতে গেলে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হয়।"

শাহানুর আকন, সিদ্দিকী আকন, আজম হাওলাদার, রাজ্জাক হাওলাদারসহ কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের পর থেকেই নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার পাঁচ থেকে সাতবার পর্যন্ত ঘর সরাতে বাধ্য হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসাইন অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদারের চাচাতো ভাই জাফর হাওলাদার অভিযোগ করেন, নদীতীরে গড়ে তোলা তার আম ও বরই বাগান নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ড্রেজারের জন্য মাটি বিক্রির প্রতিবাদ করায় তাকে হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হোগলপাতিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লোকমান বেপারী বলেন, "যারা এসব করছে তারা প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করলে হামলার আশঙ্কা রয়েছে।"

কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহিদ পারভেজের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঝাউদি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম আবুল হাওলাদার বলেন, নদীভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তবে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ অভিযোগ করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে ড্রেজার ব্যবসায়ী শামীম আকন বলেন, "আমি শুধু মাটি বিক্রি করেছি। ড্রেজার আমার নয়। এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলতে পারব না।"

মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সানাউল কাদের খান জানান, ঝাউদি ইউনিয়নে নদীতীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দলের পরিদর্শন শেষে প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে।

মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জেলা প্রশাসক মিস মর্জিনা আক্তার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে পৃথক ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ অভিযান চলবে।

নদীভাঙনের শিকার মানুষের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা না হলে আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে আরও বহু পরিবার তাদের শেষ সম্বলও হারাবে।

এসআর


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝