সরেজমিনে দৌলতদিয়া গিয়ে দেখা যায়, জিওব্যাগগুলো নদীতে ফেলা হচ্ছে এবং তা ভিডিও করছেন দুজন—গোয়ালন্দ উপজেলা প্রশাসনের একজন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট তৌহিদুল আলম জানান, বর্তমানে ঘাটে চারটি প্রকল্প চলমান রয়েছে এবং নদীতে ফেলা হবে ২৬,৬১৫টি ব্যাগ। ইতোমধ্যেই এখানে প্রায় ১২ হাজার জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। সেই হিসেবে ৩ ফুট করে প্রতিটি জিওব্যাগের প্রস্থ হলে মোট প্রস্থ দাঁড়ায় ৯,৫৮,১৪০ ফুট এবং ১ ফুট উচ্চতা ধরলে এর উচ্চতা দাঁড়ায় ৩,১৯,৯৮০ ফুট।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, জিওব্যাগ ফেলার কার্যক্রম শুরু হয় পানি বৃদ্ধির সময়। এ সময় নদীতে স্রোত বেশি থাকে, ফলে এসব ব্যাগ ফেলা কার্যত কোনো কাজে আসে না। তাছাড়া কত বস্তা ফেলা হচ্ছে আর কত বস্তার হিসাব দেওয়া হচ্ছে, সেটাও তারা জানেন না। ৬/৭ হাজার বস্তা জিওব্যাগ ফেলা হলে পাড় পুরোপুরি বাঁধা যাওয়ার কথা, অথচ কাগজে-কলমে সেই হিসাব থাকলেও বাস্তবে অল্প কিছু ব্যাগ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
২০২৫–২৬ এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দৌলতদিয়া সাত নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় ১ নম্বর প্রকল্পে ৬,৬৯০ বস্তা জিওব্যাগ ফেলার কথা রয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যেই খাতায় ৪,৯৪০ বস্তা জিওব্যাগ ফেলার হিসাব রয়েছে। এখানে ৬৯.৭৮০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ব্যাগ ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো বাঁধ দেখা যায়নি।
একই অর্থবছরে ২ নম্বর প্রকল্পের আওতায় দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় ৬৭.৬৯০ কিলোমিটার এলাকায় ৬,৭০৩ বস্তা জিওব্যাগ ফেলার কথা রয়েছে, যার মধ্যে গতকালের হিসাব অনুযায়ী ৩,৩০০ বস্তা ফেলা হয়েছে। এই বস্তাগুলো দিয়ে অন্তত একটি পাড় বাঁধা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয়রা। কিন্তু বাস্তবে সব বস্তাই পানির মধ্যে।
একই অর্থবছরে তৃতীয় প্রকল্পে দৌলতদিয়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাউল্লা ফকিরপাড়া এলাকায় ৬,৬১১ বস্তা জিওব্যাগ ফেলার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ১,৫০০ বস্তা ফেলা হয়েছে। একইভাবে চতুর্থ প্রকল্পেও ৬,৬১১ বস্তা জিওব্যাগ ফেলার কথা থাকলেও সেখানে এখন পর্যন্ত ১,৫০০ বস্তা ফেলা হয়েছে। কিন্তু এসব জিওব্যাগের সবগুলোই পানির মধ্যেই রয়েছে; দৃশ্যমান কোনো পাড় বাঁধার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া পদ্মা নদীর তীররক্ষা কাজে নিম্নমানের জিওব্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নিম্নমানের জিওব্যাগে বালি ভরার কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাগ ছিঁড়ে বালি বের হয়ে যায়। অনেক বাড়িঘরে এই জিওব্যাগ ব্যবহার করে হাঁটার পথ, বারান্দাসহ বিভিন্ন জায়গা তৈরি করা হয়েছে।
কর্মরত শ্রমিকদের এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে একজন আরিচা অঞ্চলের একটি ছবি দেখিয়ে বলেন, সেখানে বস্তা ফেলার আগে মোনাজাত করা হয় এবং নির্দিষ্ট জায়গায় এভাবে বাঁধ তৈরি করা হয়। কিন্তু এই পাড়ে তা করা হয় না। স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে পদ্মা নদীর দৌলতদিয়া অংশে বর্ষার শুরু ও শেষে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। এতে প্রতিবছর শত শত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেকের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
জিওব্যাগ ফেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ইদ্রিস শেখ বলেন, বস্তাপ্রতি ৪৪৫ টাকা হারে প্রতিটি প্রকল্পে ২৯–৩০ লাখ টাকা বাজেট রয়েছে। আমি এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজগুলো এনেছি। তাছাড়া এই কাজ কেউ করতে চায় না, লাভ না থাকার কারণে। এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন এবং মন্ত্রীর লোকজন পর্যবেক্ষণে থাকেন। এটা দেখার জন্য সরোয়ার মোল্লা এবং সুলতান ডাক্তার দায়িত্বে রয়েছেন। চারটি প্রকল্পের একটি সরোয়ার মোল্লা এনেছেন।
দৃশ্যমান না হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভাঙন এলাকার প্রায় ১০–১৫ মিটার দূর থেকে বস্তা ফেলা হয়। তিনি সরেজমিনে দেখে নেওয়ার কথাও বলেন।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুব্রত সরকার বলেন, নদীতে যে ব্যাগগুলো ফেলা হয়, সেগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রশাসন দেখাশোনা করেন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মুনতাসির হাসান খান বলেন, জিওব্যাগ প্রতিবছর ফেলা হচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজে আসছে না। সমাধানের জন্য ব্লক সিস্টেম করলে ভালো হয়। হিসাব রাখার জন্য আমাদের একজন লোক আছে। দৃশ্যমান না হওয়াকে “শুভংকরের ফাঁকি” কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি আরিচা এলাকায় ঘাট বেঁধে দেওয়া যায়, এখানেও সেভাবেই চেষ্টা করা হবে।