নেত্রকোনায় কৃষকের মুখে হাসির পরিবর্তে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর ও সমতলের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে আছে।
এদিকে জেলার কংস নদের পানি সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জারিয়ায় বিপৎসীমার ১ দশমিক ০০ সেন্টিমিটার এবং উদ্বাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ০.৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সোমেশ্বরী, ধনু, মগড়া, মহাদেওসহ সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা ছাড়াও পূর্বধলা, আটপাড়া, বারহাট্টা, কেন্দুয়া ও নেত্রকোনা সদর উপজেলার উঠতি বোরো ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। যেখানে রোরো ফসল কেটে কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা, সেখানে এখন বিষাদ নেমে এসেছে। বোরো জমিতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটতে পারছেন না কৃষকেরা।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, জেলার খালিয়াজুরী, মদন, আটপাড়া, কেন্দুয়া, কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা সদর ও বারহাট্টাসহ বিভিন্ন উপজেলার ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। শনিবার পর্যন্ত ভারী বর্ষণ কম থাকায় পানি আর বাড়েনি। কৃষকেরা এখন কিছু খেতের ধান কেটে ফেলছেন। এখনো ৮ হাজার ৫৩৪ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত রয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
নেত্রকোনা কৃষি বিভাগ, পাউবো, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার হাওরাঞ্চলসহ নিচু এলাকায় পানি জমে ক্ষেতের পাকা বোরো ধান ডুবে যায়। এ বছর নেত্রকোনায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পানিতে ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর খেতের ধান তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু খালিয়াজুরী উপজেলায় ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির পাকা ধান নিমজ্জিত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সরকারি হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণ খেতের ধান তলিয়ে গেছে। হাওরে ফসল রক্ষার জন্য এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। তবে বাঁধের কারণে এখন পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে প্রবেশ করেনি।
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার যোগিরগুহা গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম ফকির বলেন, “আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি। আমাদের গ্রামের কৃষকদের প্রায় ৫ হাজার কাটা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বিলের জমির ওপরই আমরা বেশি নির্ভর করি। এখন সব তলিয়ে গেছে। কৃষিঋণ কীভাবে শোধ করব, আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ কীভাবে চালাব, বুঝতে পারছি না।”
পূর্বধলা উপজেলার বৈরাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান তালুকদার মোশারফ বলেন, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বোরো ফসলি জমিতে পানি লেগে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে যোগিরগুহা গ্রামের কৃষকদের ক্ষতি বেশি হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পেলে তালিকা করে তাদের সহায়তা করা হবে।
আটপাড়া উপজেলার খিলা গ্রামের কৃষক মঞ্জুরুল হক বলেন, “আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। আর কয়েক দিনের মধ্যে ধান কেটে ঘরে তুলতাম। এখন বৃষ্টির পানিতে সব ডুবে গেছে। সারা বছরের সংসার খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে চালাব বুঝতে পারছি না।”
খালিয়াজুরী উপজেলার বোয়ালী গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, বৃষ্টির পানি জমে আমাদের জমির ধান তলিয়ে গেছে। হাওরের অধিকাংশ স্লুইসগেট অকেজো। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নামতে না পারায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাটা হয়নি। সারা বছর কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক কামাল হোসেন বলেন, “আমাদের অর্ধেক জমির ধান পানির নিচে। যে জমিতে এখনো ধান ডোবেনি, সে ধান কাটার জন্য ২ হাজার টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। খুবই বিপদের মধ্যে আছি।”
মোহনগঞ্জের সোয়াইর গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, “ডিঙাপোতা হাওরে ২০ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলাম। কিছু জমির ধান কাটা হয়েছে, বাকি ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। খড়ও শুকাতে পারছি না।”
খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি জমির ধান কাটা হয়েছে। ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। পানি বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওরের সবগুলো বেড়িবাঁধ এখনো ঠিক আছে। বাঁধ যাতে না ভাঙে সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবার বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতার কারণে এ সমস্যা হয়েছে।
কৃষকেরা জেলা প্রশাসকের কাছে কৃষিখাতে অব্যবস্থাপনা, শ্রমিক সংকট, ধান কাটার হারভেস্টার মেশিনের অভাব, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং দীর্ঘদিন জলমহাল খনন না হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
এ সময় জেলা প্রশাসক তাদের কথা শুনে সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি জানান।
এসআই/আরএন