সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় বান্দরবানের রুমা উপজেলার জন্য ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ১২.৫০ মেট্রিক টন ত্রাণের চাল ও ভোজ্যতেল বিতরণকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
উপকারভোগীদের একাংশের অভিযোগ, তাদের মধ্যে বিতরণ করা চালে পোকা ছিল এবং ভোজ্যতেলের মানও ছিল নিম্নমানের। অভিযোগটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫০০টি পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণের প্রথম ধাপে গত বুধবার (১৫ জুলাই) ৩০০টি পরিবারের মধ্যে চাল ও ভোজ্যতেল বিতরণ করা হয়। অবশিষ্ট ২০০টি পরিবারের মধ্যে শনিবার (১৮ জুলাই) ত্রাণ বিতরণের কথা রয়েছে।
সরেজমিনে সেগুন খামার এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবার অভিযোগ করে জানায়, বন্যায় তাদের পুকুর, মুরগির খামার, ওল, কচু ও বিভিন্ন সবজির ক্ষেত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা কোনো ত্রাণ সহায়তা পাননি। অথচ যাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিকবার ত্রাণ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। ক্ষতিগ্রস্তদের ভাষ্য, জেলা পরিষদের প্রস্তুত করা উপকারভোগীর তালিকা দেখে তারা হতাশ হয়েছেন।
অন্যদিকে ত্রাণপ্রাপ্ত কয়েকজন উপকারভোগী বলেন, চালে পোকা থাকায় তা খাওয়ার উপযোগী ছিল না। অনেকেই সেই চাল মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি নিম্নমানের ভোজ্যতেলও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, একদিকে বন্যার ক্ষতি, অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণের চাপ—এর মধ্যে নিম্নমানের ত্রাণসামগ্রী তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য লালজারলম বম বলেন, চাল ভালো না খারাপ—এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। প্যাকেট প্রস্তুতের সময় আমার প্রতিনিধি লালপিয়াংথাং বম দায়িত্বে ছিলেন। তিনি যদি আমাকে বিষয়টি না জানিয়ে থাকেন, তাহলে আমার জানার সুযোগ ছিল না।
তবে সদস্যের প্রতিনিধি লালপিয়াংথাং বম ভিন্ন বক্তব্য দিয়ে বলেন, খাদ্যগুদাম থেকে চাল আনার পরই তিনি চালের মান খারাপ দেখতে পান এবং সঙ্গে সঙ্গে জেলা পরিষদের সদস্য লালজারলম বমকে ফোনে বিষয়টি অবহিত করেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং ত্রাণ বিতরণের প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে বলা হয়। ফলে তার আর কিছু করার ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
রুমা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা বলেন, সদর ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে চালের প্যাকেট প্রস্তুত করা হলেও চেয়ারম্যান বা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। পুরো কার্যক্রম জেলা পরিষদের সদস্যের প্রতিনিধি লালপিয়াংথাং বমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছে।
রুমা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পিপুল মারমা বলেন, গুদামে আগে থেকেই সংরক্ষিত কিছু চাল সাম্প্রতিক বন্যার কারণে আংশিক নষ্ট হয়ে যায়। তবে গুদামেই যদি চাল প্যাকেটজাত বা বিতরণ করা হতো, তাহলে চালের মান যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা গুদাম থেকে চাল নিয়ে সদর ইউনিয়ন পরিষদে প্যাকেট প্রস্তুত করায় তার আর কিছু করার ছিল না। তিনি জানান, চাহিদা অনুযায়ী ১২.৫০ মেট্রিক টন চাল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথী বলেন, চালের প্যাকেট প্রস্তুতের সময় উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করা হয়নি। ফলে চালের মান যাচাইয়ের সুযোগ হয়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় এলে জানতে পারি। এরপর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে ভবিষ্যতে ভালো মানের চাল সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছি।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ বিতরণকে ঘিরে জেলা পরিষদের সদস্য, তার প্রতিনিধি, খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ ও ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে নিম্নমানের ত্রাণসামগ্রী বিতরণের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথী, জেলা পরিষদের সদস্য লালজারলম বম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি থুইসাঅং মারমা, ২ নম্বর রুমা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা, বিএনপির নারী নেত্রী ঙৈনুচিং মারমা, চিংসাথোয়াই মারমা (বিপ্লব)সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
ইউএম/আরএন