বরগুনার আমতলীতে দিগন্ত জোড়া মাঠজুড়ে এখন কেবলই হলুদের সমারোহ। যে দিকে চোখ যায়, সে দিকেই বাতাসের তালে দোল খাচ্ছে সূর্যমুখী ফুল। চলতি ২০২৫-২৬ রবি মৌসুমে উপজেলায় সূর্যমুখীর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ভালো ফলন হওয়ায় খুশির ঝিলিক দেখা দিয়েছে স্থানীয় কৃষকদের চোখে মুখে।
স্বল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন উপজেলার কৃষকরা। যা উপজেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
আমতলী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ৩০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং পরিমিত সেচ ও সারের ব্যবহারের ফলে প্রতিটি গাছেই বড় আকারের ফুল এসেছে।
কৃষকরা বলছেন, সরকারি ভাবে বিনামূল্যে উচ্চ ফলনশীল বীজ ও সার পাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ অনেক কমেছে। এছাড়া কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতির প্রয়োগ ফলন বৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রতি একর জমিতে সূর্যমুখীর ৩২ থেকে ৩৫ মণ ফলন হয়। সূর্যমুখীর তেল ছাড়াও খৈল দিয়ে মাছের খাবার এবং গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ার মূল কারণ এর উচ্চ বাজারমূল্য ও বহুমুখী ব্যবহার। ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখীতে খাটুনি কম কিন্তু মুনাফা বেশি। উৎপাদিত সূর্যমুখী থেকে প্রাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত ভোজ্যতেল পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে কৃষকরা আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন।এছাড়া, সূর্যমুখীর খৈল পশুখাদ্য হিসেবে এবং শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে কৃষকরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন।
আমতলী উপজেলার সেকান্দারখালী গ্রামের চাষি মো. সোলায়মান বলেন, 'এ বছর ২ বিঘা জমিতে সূর্যমূখী চাষ করেছি। আগে এই জমিতে শুধু রবি শস্য করতাম, কিন্তু এবার কৃষি অফিসের পরামর্শে সূর্যমুখী লাগিয়েছি। ফলন দেখে আমি নিজেই অবাক! একেকটি ফুল যেন থালার মতো বড় হয়েছে। অন্য ফসলের চেয়ে এতে সেচ ও সার কম লাগে, অথচ লাভ অনেক বেশি। নিজের পরিবারের তেলের চাহিদা মিটিয়েও ভালো দামে বাজারে বীজ বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।'
পাতাকাটা গ্রামের কৃষক মো. লিটন সিকদার বলেন, 'আমি এবং আমার স্ত্রী শখের বশে এক একর জমিতে সূর্যমুখী আবাদ শুরু করি। এখন আমাদের ক্ষেত দেখতে প্রতিদিন অনেক মানুষ ভিড় করছে। সূর্যমুখীর খৈল আমাদের গবাদি পশুর জন্য দারুণ পুষ্টিকর খাদ্য হবে। আগামী বছর এই চাষ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে।'
ঘটখালী গ্রামের কৃষক মো. কাইসার বলেন, 'বাজারে সয়াবিন তেলের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে সূর্যমুখী চাষ আমাদের জন্য আশীর্বাদ। এই গাছ অনেক শক্তপোক্ত হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ক্ষতি কম হয়। এছাড়া ক্ষেতের শুকনো গাছগুলো আমরা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারছি। লাভ আর বহুমুখী ব্যবহারের কারণে আমাদের এলাকার অনেক কৃষকই এখন সূর্যমুখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।'
আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, 'এ অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সূর্যমুখী চাষ বড় ভূমিকা রাখছে। উপজেলার এই কৃষি সাফল্য স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি উপজেলার বেকার তরুদেরও কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে অনুপ্রাণিত করছে।'
তিনি বলেন, 'মূলত সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি এবং কৃষকদের সচেতনতাই এর প্রধান কারণ। কৃষকদের বিনামূল্যে উচ্চ ফলনশীল বীজ ও সার সরবরাহ করার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন।'
এসকে/এমএ