আকস্মিক ঝড়ে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণ উপকূলের বিছিন্নদ্বীপ ঢালচরের প্রায় দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে অসংখ্য গাছপালাও উপড়ে পড়েছে। চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো। আর মাত্র তিন দিন পরই খুশির ঈদ। কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের অর্ধশত পরিবারে ঈদ আনন্দ নেই। তাদের ঈদ আনন্দ কেড়ে নিয়েছে মঙ্গলবার রাতের ঝড়।
সকালে ঢালচরে গিয়ে দেখা যায়, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত টিনের ঘরে চালা মেরামতের চেষ্টা করছেন মফিজ নামের একজন জেলে। তিনি জানান, ঝড়ের সময় একটি গাছ ভেঙে পড়ে ঘরের চালা ভেঙে গেছে। বর্তমানে তাঁর পরিবারের ছয়জন সদস্য প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সেই বাড়িতে থেকেই তারা রাতে সেহরি করেছেন। তবে এখনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধি তাদের খোঁজ-খবর নিতে আসেনি, দাবি করেছেন মফিজ।
এমন অভিযোগ শুধু মফিজের একার নয়; এই চরের ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ মানুষের অভিযোগ একই। তারা জানান, মঙ্গলবার রাত প্রায় ২ টার দিকে হঠাৎ করেই প্রবল গতির ঝড় শুরু হয়। প্রথমে হালকা বাতাস থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যে তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। ঝড়ের সঙ্গে গুড়ি গুড়ি শিলা বৃষ্টিও হয়। ঝড়ের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে টিনের ছাউনি উড়ে গেছে এবং কাঁচা ঘরবাড়ি মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। অনেক পরিবার রাতের আঁধারেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটোছুটি করতে থাকে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢালচর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। তাদের অধিকাংশই কাঁচা ঘরে বসবাস করায় ঝড়ের আঘাত সহ্য করতে পারেনি। অনেকের ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর, কুকরি মুকরি, চর পাতিলা, চর নিজাম, চর ফারুকি, চর মানিকা, নজরুল নগরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় অর্ধশত বাড়িঘর ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঢালচর ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মফিজ জানান, প্রতিদিনের মতো ওইদিন রাতে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন। সেহরির সময়ের দুই ঘণ্টা আগে দক্ষিণ থেকে ধেয়ে আসা তীব্র বাতাসে তার বসত ঘরের চালা উড়ে যায়। তিনি বলেন, “আজ থেকে তিন দিন পরই ঈদ। ঈদের আগেই আমাদের মাথাগোজার ঠাই হারিয়ে ফেলেছি। ঝড় আমাদের ঈদ আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। শুধু আমি না, আমার মতো আরও বহু পরিবার বসত ঘর হারিয়ে পথে বসেছে।”
ঢালচরের কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. হাসান, মো. ইব্রাহিম, মো. জসিম, আক্তার, মো. রিয়াজ, শাহিন হাওলাদার, মো. আনোয়ার ও মোগিয়াস উদ্দিনের বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চরের মহিফুল বেগম অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “এই যে ঈদ সামনে, ছেলে-মেয়ে নিয়ে আনন্দে ঈদ কাটাবো এমন আশা ছিল। কিন্তু হঠাৎ সবকিছু উল্টাপাল্টা হয়ে যাবে ভাবতেও পারিনি। এখন ভাঙাচোরা বাড়ি ঠিক করতে টাকার দরকার। আমরা তো দিনমজুর, দিন আনি দিন খাই। আমাদের ঈদ আনন্দ তো ঝড়ে উড়ে গেছে। এখন সরকার যদি সাহায্য করে তাহলে কিছুটা রেহাই পাবো।”
চর মানিকা ইউনিয়নের চর কচ্চপিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেলিম হাওলাদার বলেন, “আমি একজন ব্যবসায়ী। বাতাসের প্রবল চাপের কারণে চর কচ্চপিয়া বাজারে আমার একটি দোকানের ঘরের চালা উড়ে গেছে।”
ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও ঢালচর বন কর্মকর্তা মুইনুল জানান, হঠাৎ ঝড়ে প্রায় ঢালচরে ত্রিশটি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্থের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এমাদুল হোসেন জানান, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
এসএফ/আরএন