ঈদ মানেই আনন্দ আর উৎসবের আমেজ হলেও উপকূলীয় বরগুনার আমতলীসহ জেলেপল্লীগুলোতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর ঘনিয়ে এলেও সাগরে মাছের আকাল আর আর্থিক সংকটে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে পরিবার। অনেকের ঘরে ঈদের দিন সেমাই বা ফিরনি জোটানোই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আমতলী, পাথরঘাটা, তালতলীসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উৎসবের কোনো প্রস্তুতি নেই এসব পরিবারে। যেখানে দেশের অন্য প্রান্তের মানুষ ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত, সেখানে উপকূলের জেলেরা দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়।
জেলেরা জানান, কয়েক মাস ধরে নদী ও সাগরে মাছের সংকট চলছে। এর ওপর ডিজেলের উচ্চ মূল্য ও কৃত্রিম সংকটের কারণে অনেক ট্রলারই সাগরে যেতে পারেনি। ফলে আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
দক্ষিণ চরদুয়ানী গ্রামের জেলে জসিম বলেন, 'নদীতে কয়েক মাস ধইরা মাছ নাই। মাছ না পাইলে টাহাও আয় অয় না। মাইনষের ঘরে ঈদের আনন্দ থাকলেও আমাগো এহন পর্যন্ত পোলাপানরে নতুন জামা আর সেমাইও কিনতে পারি নাই।'
আজগরকাঠি গ্রামের লাভলী আক্তার বলেন, 'কয়েক বছর আগে স্বামী সাগরে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে সন্তানদের নিয়ে অতিকষ্টে দিন পার করছি।'
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, 'আমাগো বাড়িতে কোনো ঈদ হয় না। পাশের বাড়ি থেইকা কেউ কিছু দিলে ওইডা দিয়াই কোনোমতে দিন কাটে।'
সোনাতলা গ্রামের আনছার মাঝি সাত দিন সাগরে থেকে ফিরেছেন কোনো মাছ ছাড়াই। তিনি বলেন, 'ভাগে কোনো টাকা না পাওয়ায় এখনো ঈদের বাজার করতে পারিনি। একদিকে এনজিও'র ঋণের চাপ, অন্যদিকে মহাজনের দাদনের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে জেলেরা এখন দিশেহারা।'
আমতলীর বৈঠাতাচা জেলেপল্লীর কবির মিয়া বলেন, 'মোগো কোনো ঈদ নাই। ঈদ করবো কি দিয়া। বাজারে তেল নাই মাছ ধরতে যাইতে পারিনা। বাড়ি বইয়া ধার দেনা করে কোনো রকম তিন বেলা পোলা-মাইয়া-বউ লইয়া ভাত খাই। আবার ঈদ করমু কি দিয়া?'
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি চৌধুরী গোলাম মোস্তফা বলেন, 'ডিজেল সংকট ও মাছ না পাওয়ার কারণে উপকূলের হাজার হাজার জেলে পরিবার এবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।সাধারণত ঈদের সময় জেলেপল্লীতে যে কর্মচাঞ্চল্য থাকে, এবার তার বদলে কেবল নীরব হাহাকার বিরাজ করছে।'
ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলেও উপকূলীয় এই জেলেপল্লীগুলোতে উৎসবের আলো নেই। অভাব আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতে করতে এসব পরিবারের কাছে ঈদ এখন শুধুই এক নীরব হাহাকারে পরিণত হয়েছে।
এসকে/এমএ