চায়ের দেশ মৌলভীবাজারে এখন চায়ের কাপে কাপে ঘুরছে ভোটের হিসাব। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই গ্রাম, শহর আর চা বাগানের অলিগলিতে বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। আর মাত্র তিন দিন বাকি—এই সময়টায় উঠান বৈঠক, পথসভা আর ভোটের অঙ্কে মুখর পুরো জেলা। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ায় এবারের নির্বাচন ঘিরে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি প্রত্যাশার উত্তাপও স্পষ্ট।
কমলগঞ্জের মাধবপুর চা বাগানে কথা হয় চা শ্রমিক সুনিলা গুঞ্জ-এর সঙ্গে। হাতে কাঁচা চা পাতা, মুখে লাজুক হাসি। তিনি বলেন, ‘আগে ভোট এলেই শুধু কথা শুনতাম। এবার মনে হচ্ছে আমাদের ভোটের দাম আছে।’ তার মতো প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার চা শ্রমিক ভোটারই এবারের নির্বাচনে মৌলভীবাজারের সবচেয়ে বড় ও নির্ণায়ক শক্তি।
চারটি সংসদীয় আসনের এই জেলায় প্রতিটি আসনেই আলাদা রাজনৈতিক সমীকরণ। কোথাও হাড্ডাহাড্ডি দ্বিমুখী লড়াই, কোথাও ত্রিমুখী কিংবা চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জেলার তিনটি আসনে ধানের শীষের বিপরীতে দাঁড়িপাল্লা প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ভোটের হিসাব আরও জটিল করে তুলেছে।
চা শ্রমিকদের পাশাপাশি নতুন ভোটাররাও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কুলাউড়ার আসনের কলেজ ছাত্র শুভ যাদব বলেন, ‘প্রথমবার ভোট দেব। প্রতীক দেখে না, কে এলাকায় কাজ করবে সেটাই দেখব।’ বিশেষ করে চা-বাগান এলাকায় যুক্ত হওয়া নতুন ভোটারদের মন জিততে প্রার্থীরা বাড়তি প্রচারণা চালাচ্ছেন।’
এবারের নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন প্রবাসী ভোটাররা। প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন তাঁরা। জেলার চারটি আসনে প্রায় ২৪ হাজার প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করায় তাঁদের ভোটও জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কমলগঞ্জে শিমুল নামে এক ভোটার বলেন, ‘বিদেশে থেকেও দেশের সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারছি—এটাই বড় কথা।’
নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, ৭ উপজেলা, ৬ পৌরসভা ও ৬৭ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার জেলার চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২৩ জন প্রার্থী। এবারে জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১৭ লাখ ৭২ হাজারের বেশি, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় আড়াই লাখ বেশি।
আসনভিত্তিক চিত্রেও রয়েছে ভিন্নতা। মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা–জুড়ি) আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট। মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে বরাবরের মতোই ভোটের সমীকরণ জটিল; এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা বেশি। মৌলভীবাজার-৩ (সদর–রাজনগর) আসনে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় স্থানীয়দের ধারণা, ধানের শীষ এগিয়ে আছে। আর সর্বাধিক চা শ্রমিক অধ্যুষিত মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ) আসনে মূল লড়াই ধানের শীষ ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে উঠছে।
গ্রাম থেকে চা বাগান—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, কার হাতে যাবে এলাকার নেতৃত্ব? ভোটারদের ভাষায়, এবার প্রতীক নয়; গুরুত্ব পাচ্ছে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, সততা আর এলাকার জন্য কাজ করার সক্ষমতা। মৌলভীবাজারে এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়—এটি দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার উৎসবও। চায়ের দেশ এখন সত্যিই রূপ নিয়েছে ভোটের রাজ্যে।
এসএস/এসআর