বাংলাদেশের উত্তর–পূর্বাঞ্চলের পর্যটন মানচিত্রে চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজার এক অনন্য নাম। দেশের নানা প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় সারা বছর মুখর থাকে এই জেলা। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল—কমলগঞ্জ যার পরিচিতি প্রকৃতি, চা–বাগান আর বন্যপ্রাণে ভরপুর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে ঘিরে। এই পর্যটননগরীতে যাতায়াতের জনপ্রিয় বাহন ‘চান্দের গাড়ি’। রোমাঞ্চকর এই বাহনেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—বন্যপ্রাণীর জন্য ক্রমবর্ধমান মৃত্যুঝুঁকি।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কপথে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো বন্যপ্রাণী প্রাণ হারাচ্ছে দ্রুতগামী যানবাহনের নিচে পিষ্ট হয়ে। নিহত প্রাণীদের বড় একটি অংশ নিশাচর—যারা রাতের অন্ধকারে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। একইভাবে রেললাইনেও ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘কমলগঞ্জ–লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সড়কে নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার বিষয়ে চান্দের গাড়ির চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশিক্ষণের কোনো প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে চোখে পড়ে না বললেই চলে।’
লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর অনুরোধ জানালে অনেক চালকের যুক্তি—গতি কমালে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি উঠবে না। কিন্তু এই যুক্তির আড়ালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক নির্মম সত্য। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নির্দেশনা যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ। পর্যটক বহনে কে কত দ্রুত যেতে পারে—এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাই এখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে।
চোর যেমন ধর্মকথা শোনে না, তেমনি কিছু চালকও বন্যপ্রাণী রক্ষার বাণী শোনে না—এটাই এখনকার বাস্তবতা। বন্যপ্রাণীর মৃত্যু যদি অনিবার্য হয়েই দাঁড়ায়, তবে কি চালকদের শুভবুদ্ধির কোনো জাগরণ হবে? প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রশাসনের উদ্যোগ কি আদৌ মাঠে কার্যকর, নাকি তা প্রশিক্ষণের আতুরঘরেই মৃত্যুবরণ করেছে?
সর্বশেষ রোববার (২৫ জানুয়ারি) শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জ সড়কে চান্দের গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছে লাউয়াছড়া বনের একটি উল্টোলেজি বানর। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়ক অংশেই।
উল্লেখ্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর বনভূমিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে সরকার। এই উদ্যানে রয়েছে বিশ্বব্যাপী বিরল ও বিপন্ন বহু প্রজাতির বৃক্ষ, উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী। অথচ এই সংরক্ষিত বনের বুক চিরে চলে গেছে প্রায় ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উপজেলা সংযোগ সড়ক এবং প্রায় ৮ কিলোমিটার রেলপথ।
খাদ্য সংকট ও অবাধ যানচলাচলের কারণে প্রতিদিনই এসব সড়ক ও রেলপথে প্রাণ হারাচ্ছে একাধিক বন্যপ্রাণী। দীর্ঘদিন ধরে প্রাণিপ্রেমীরা মৃত্যুর এই মিছিল ঠেকাতে আন্দোলন করে এলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।
পরিবেশবাদী ও সাংবাদিক পারভেজ ও জাহেদ আহমদ বলেন, ‘প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ রক্ষায় কেবল নির্দেশনা আর প্রশিক্ষণই কি যথেষ্ট? নাকি প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি? না হলে লাউয়াছড়ার সবুজ বন একদিন নিঃশব্দ হয়ে উঠবে—চাকার নিচে চাপা পড়ে।’
বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সিতেশ রঞ্জন দেব বলেন, ‘শুধু সড়কে নয়, অনেক সময় বনের ভেতরেও প্রাণীদের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। আমার ধারণা, রাস্তায় গাড়ির আঘাতে আহত হয়ে তারা বনের ভেতরে গিয়ে মারা যায়। শুধু সড়ক ও রেলপথেই নয়, খোলা বৈদ্যুতিক লাইনের কারণেও বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে। লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে টানা বিদ্যুৎ লাইনে বিরল প্রজাতির বাদুড় ও বানরের মৃত্যু হচ্ছে। এভাবে প্রায়সময় প্রাণী মারা যাচ্ছে।’
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ শ্রীমঙ্গলের রেঞ্জার কাজী নাজমুল হকের ভাষ্য, ‘প্রাণীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলার কথা থাকলেও বিষয়টি কেউ মেনে চলেন না। শুধু ট্রেন নয়, সড়কপথেও গাড়িগুলো সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিতে চলার কথা। এই আইন কেউ মানে না। এ ছাড়া অতিরিক্ত পর্যটক বন ও প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন প্রায় সময় বানরের মৃত্যু আমরা কখনো এটা আশা করিনি। এর আগেও সড়ক দুর্ঘটনায় বানর মারা গেছে।
রোববার যে বানরটি মারা গেছে, তার ঘটনায় আমরা ইতোমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আমরা বারবার গাড়িচালকদের নির্ধারিত গতিসীমার মধ্যে গাড়ি চালানোর নির্দেশনা দিই, কিন্তু তারা নিয়ম মানে না। যে গাড়িটি বানরটিকে হত্যা করেছে, সেটিকে শনাক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’
এসএস/এসআর