মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রশাসনের একের পর এক অভিযান, জরিমানা ও কারাদণ্ডের পরও বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া, নদী ও কৃষিজমি থেকে বালু তুলে নিচ্ছে সক্রিয় চক্র।
এতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়েছে কৃষিজমি, সড়ক, সেতু ও বসতবাড়ি।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে মোট ২৮টি বালুর কোয়ারি ও মহাল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি সাধারণ বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি ইজারার বাইরে রয়েছে। এসব এলাকাকে কেন্দ্র করেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আইনে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। এসব অভিযানে ১ লাখ ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫০ টাকা।
এর ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর আরও দুটি অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ অক্টোবর রায়পরান পশ্চিমপাড়া মসজিদসংলগ্ন এলাকা থেকে ১৬ হাজার ঘনফুট এবং ২ নভেম্বর মুড়াছড়া ও বৌলাছড়া ভাঙা পুলসংলগ্ন এলাকা থেকে ১০ হাজার ঘনফুট বালু উদ্ধার করা হয়।
অভিযান দুটিতে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম। তিনি জানান, অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে জরিমানা বা কারাদণ্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। জব্দ করা বালু আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্রীমঙ্গলের সদর, সিন্দুরখান, আশিদ্রোন, সাতগাঁও, ভূনবীর, মির্জাপুর ও কালাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উপজেলার ৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিশেছে। এসব ছড়া থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর আগে সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ ও কালাপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ভেকু ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ এবং ধ্বংস করেছে প্রশাসন। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না।
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি বালুবাহী ডায়না গাড়ির চাপায় অটোরিকশা ও টমটমের চালকসহ ছয়জন আহত হন। এ ঘটনার পর উত্তেজিত লোকজন গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। একই সঙ্গে শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়।
এ ছাড়া ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং পরিবেশের ক্ষতিসাধনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তবে মামলাটির সাল সম্পর্কে প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
অন্যদিকে, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ ও আন্দোলন করে আসছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি, পাহাড় রক্ষা উন্নয়ন কমিটিসহ কয়েকটি সংগঠনের নেতারা জানান, বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা এ বিষয়ে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ দাবি করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে পাহাড়, ছড়া, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য আ.স.ম. ছালেহ সোহেল বলেন, পাহাড়ি ছড়া থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও ছড়ার তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হতে পারে। এতে তীরভাঙন বাড়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, সড়ক, সেতু ও বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে পারছে না, যা উদ্বেগজনক। শুধু ইজারার বাইরে থাকা এলাকাই নয়, বালুর টিলা ও কৃষিজমি থেকেও অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ও এলাকার সামগ্রিক ক্ষতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, উপজেলায় অবৈধ বালু উত্তোলন দীর্ঘদিনের সমস্যা। এটি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জড়িতদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শাস্তি ভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে কেউ কেউ আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। এ কারণে অভিযান চালিয়েও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে পাহাড়, ছড়া ও কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এসএস/এসএস