ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
কাগজে শতভাগ কাজ, বাস্তবে মেঠোপথ-শেরপুরে প্রকল্পে হরিলুটের অভিযোগ
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৮ পিএম
X

কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে কোথাও মাটি বা ইটের কাজ করা হয়নি। আবার কোথাও পুরোনো ইটের ওপর সামান্য বালু ফেলে নতুন প্রকল্পের বিল উত্তোলন করা হয়েছে। বগুড়ার শেরপুরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর, কাবিটা ও কাবিখা) আওতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলায় ১৭২টি প্রকল্পের বিপরীতে নগদ ৩ কোটি ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং চাল ও গম মিলিয়ে প্রায় ১৭৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বরাদ্দের বিপরীতে বেশির ভাগ স্থানেই মাঠপর্যায়ে কাজের যথাযথ প্রতিফলন নেই।

কুসুম্বী ইউনিয়নের শেওলাগাড়ী জামে মসজিদ থেকে নূর ইসলামের বাড়ি পর্যন্ত সড়কে তিন লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম, আব্দুল রশিদ ও আলতাফ হোসেন জানান, সেখানে কোনো উন্নয়নকাজ হতে তাঁরা দেখেননি। প্রকল্পের সভাপতি মো. সাইদুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিন আগের ঘটনা হওয়ায় বিষয়টি তাঁর মনে নেই।

একই ইউনিয়নের উদয়কুঁড়ি-উছলবাড়ীয়া সড়কে পাঁচ লাখ টাকার সোলিং প্রকল্পে তিন ধাপে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার ইট বিছানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম, মো. মিলন ও মো. রফিকুল ইসলাম জানান, পুরো প্রকল্পে মাত্র ছয়জন শ্রমিক কাজ করেছেন। বরাদ্দের তুলনায় কাজের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত নগণ্য।

এ ছাড়া হাপুনিয়া গোরস্থানপাড়ায় চানমিয়ার বাড়ি থেকে গোরস্থান পর্যন্ত সড়কের সোলিংয়ের কাজ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাব্বির।

কুসুম্বীর কাঁশিপাড়ায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে পশ্চিম দিকে এবং নন্দীগ্রামমুখী সড়কে যথাক্রমে ১ লাখ ১৫ হাজার ও ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৩৬ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ৪৩৬ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে বড়জোর এক হাজার ইটের কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় আফসার আলী ও হাদিউল ইসলাম। স্থানীয় নায়েব আলী ও সিদ্দিক জানান, নন্দীগ্রাম সড়কে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে।

স্থানীয় অভিভাবক মিলি আক্তার জানান, রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকদের ধান পরিবহনে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কাঁশিপাড়া প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য মো. মোকছেদ আলী বলেন, কাজ সঠিকভাবেই করা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় কিছু লোক ইট তুলে নিয়েছেন।

বিশালপুর ইউনিয়নের কহিতকুলে রায়হানের বাড়ি থেকে আবুলের বাড়ি পর্যন্ত টিআর প্রকল্পের দুই লাখ টাকার কাজে কোনো নতুন ইট ব্যবহার করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জাহাঙ্গীর হোসেন ও খলিলুর রহমান জানান, চার বছর আগে নির্মিত এ সড়কের মাঝের প্রায় ৬০ ফুট অংশের পুরোনো ইট তুলে দেড় বছর আগে সেখানে বালু বিছানো হয়েছিল। নতুন কোনো কাজ না করেই সেই পুরোনো কাজের বিপরীতে বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

একই ইউনিয়নের নাইশিমুলে সোবাহানের বাড়ির পুকুরপাড়ে কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৭ দশমিক ৬৬ টন গম বরাদ্দে নির্মিত গাইডওয়াল মূল সড়কের তুলনায় প্রায় ১০ ইঞ্চি নিচু। ফলে বৃষ্টির পানিতে সড়ক ডুবে থাকে বলে জানান আব্দুস সোবাহান, মোহাম্মদ মিজান, মো. আবিরউদ্দিন ও রোশমি বেগম।

পশ্চিম নাইশিমুলে গগেনের বাড়িমুখী সড়কে চার টন চালের প্রকল্পে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের পাশাপাশি মূল পাকা সড়কের সংযোগমুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেন নয়ন কুমার সরকার, মন্টু চন্দ্র ও দিনেশ চন্দ্র।

ভবানীপুর ইউনিয়নের আটাইলে পাশাপাশি দুটি সড়কে কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৫ লাখ ১ হাজার ৫২০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বড়জোর ১ লাখ ২০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। এমনকি কোনো মাটিও ফেলা হয়নি বলে জানান স্থানীয় জিন্নাত আলী ও মো. সোহেল।

একই ইউনিয়নের বড়াইদহ পশ্চিমপাড়া ঈদগাহ মাঠ সংস্কারে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ২৫ গাড়ি মাটি ফেলা হয়েছে বলে জানান মো. গোলাম, লিলি, আকাশ ও আরাফাত সানী। তাঁদের দাবি, এ কাজে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, “চেয়ারম্যান ও সচিব যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, সেভাবেই করেছি।” তবে ভবানীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, “সিডিউল অনুযায়ী তদারকির দায়িত্ব প্রকল্প সভাপতির। নিজের দায় তিনি এড়াতে পারেন না।”

খামারকান্দি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোড়দৌড় নতুনপাড়ায় মজিদের বাড়ি থেকে জামে মসজিদ অভিমুখী সড়কে ব্রিক সোলিং ও মাটি ভরাটের জন্য কাবিখা প্রকল্পের আওতায় ৮ দশমিক ০২৯১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আর্থিক মূল্য প্রায় চার লাখ টাকা। প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য সাদিক হাসান শামীম।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো সড়কটিই কাঁচা মেঠোপথ হিসেবে পড়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. বাদশা জানান, সড়কে মাটি ভরাট কিংবা ইট বিছানোর কোনো কাজই করা হয়নি। এমনকি বরাদ্দ সম্পর্কেও গ্রামবাসী কিছু জানেন না।

একই ইউনিয়নের ঘোড়দৌড় পশ্চিমপাড়ায় হাফিজের বাড়ি থেকে সালামের বাড়ি পর্যন্ত সড়কে কাবিখা প্রকল্পে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে কোনো মাটি ফেলা হয়নি। পুরোনো ইটের সঙ্গে মাত্র দুই ট্রলি নতুন ইট ও বালু ফেলে কাজ শেষ করা হয়েছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাহাদৎ হোসেন।

পারভবানীপুর জান্নাতপাড়ায় মজিবরের বাড়ি থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে যাওয়া সড়কে ২ লাখ ৪১৫ টাকার কাজেও নতুন কোনো ইট বা মাটি ব্যবহার করা হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা লাল মিয়া অভিযোগ করেন, তিন বছর আগের পুরোনো ইট তুলে নামমাত্র বালু দিয়ে আবার বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মাগুড়ার তাইড় হাজীপাড়ায় পুকুরপাড়ে গাইডওয়াল নির্মাণ ও মাটি ভরাটের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো মাটি ফেলা হয়নি বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদুর রহমান।

এ বিষয়ে খামারকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিলন হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে মাটি ভরাট ও প্যালাসাইটিংয়ের কাজ বাকি ছিল। দ্রুতই তা সমন্বয় করা হবে।

এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আব্দুল জব্বারের কার্যালয়ে গেলে তিনি অপেক্ষা করতে বলে বাইরে চলে যান। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তিনি আর কার্যালয়ে ফেরেননি। পরে তাঁর সরকারি মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, “আমার যোগদানের আগেই অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে যেসব প্রকল্পে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এসএ/আরএন

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১
E-mail: [email protected], [email protected]. [email protected], [email protected], [email protected], ‍[email protected], Online-email: [email protected]

🔝