ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেট: আপত্তি থেকে মানিয়ে নেওয়ার পথে
সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, নকশা ও বিন্যাসে নমনীয়তা আনল সরকার
✎ শাহরিয়ার স্বপ্নীল
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৬ পিএম
X

মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বরপ্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা, সমালোচনা ও আপত্তিতে সরব ছিলেন বাইকাররা। নির্দিষ্ট মাপের প্লেট সব ধরনের মোটরসাইকেলে স্থাপন করা সম্ভব কি না, এতে বাইকের নকশা ও সৌন্দর্য কতটা প্রভাবিত হবে এবং বাড়তি খরচের দায় কে নেবে এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি কেউ কেউ প্রতীকী প্রতিবাদও জানান।

তবে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি সরকার। বরং বাইকারদের আপত্তি ও বাস্তব সমস্যার বিষয়গুলো সামনে আসার পর প্রথমে নম্বরপ্লেট স্থাপনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। এরপর সর্বশেষ ১ নভেম্বর সড়ক পরিবহণ বিধিমালা, ২০২২ সংশোধন করে প্লেটের নকশা, মাপ ও নম্বর লেখার বিন্যাসে কিছুটা নমনীয়তা আনা হয়েছে। এতে সামনের নম্বরপ্লেট বাধ্যতামূলক রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সিদ্ধান্ত থেকে বাধ্যবাধকতা

মোটরসাইকেলের সামনের অংশেও নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক ফলোআপ সভায়। ঢাকার সড়কে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরার মাধ্যমে মোটরসাইকেলের নম্বর শনাক্ত করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ)।

এ বিষয়ে কারিগরি দিক যাচাই করতে ১৩ আগস্ট সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিআরটিএ। কমিটিকে নম্বরপ্লেটের আকার, মোটরসাইকেলে তা স্থাপনের স্থান এবং এআই ক্যামেরায় নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব কি না এসব বিষয় পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর ১৬ অক্টোবর জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিআরটিএ। এতে পেছনের বিদ্যমান ডিজিটাল নম্বরপ্লেটের পাশাপাশি মোটরসাইকেলের সামনের অংশেও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট স্থাপন ও প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ জন্য প্রথমে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

প্রাথমিক নির্দেশনায় স্কুটারের সামনের নম্বরপ্লেটের দৈর্ঘ্য ২০০ মিলিমিটার ও প্রস্থ ১০০ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়। অন্যান্য মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে মাপ ঠিক করা হয় ২৮৫ মিলিমিটার দৈর্ঘ্য ও ৫০ মিলিমিটার প্রস্থ। উভয় ক্ষেত্রেই অক্ষর ও সংখ্যার উচ্চতা কমপক্ষে ২০ মিলিমিটার রাখার কথা বলা হয়।

প্লেট তৈরির উপাদান হিসেবে স্টেইনলেস স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারের নির্দেশনা ছিল। পটভূমি সাদা এবং অক্ষর ও সংখ্যা কালো বাংলা হরফে লেখার কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্লেটে অতিরিক্ত নকশা বা সাজসজ্জা ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়নি।



আপত্তির কেন্দ্রে মাপ, নকশা ও বাস্তবতা

নির্দেশনা প্রকাশের পরপরই মোটরসাইকেল মালিকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে আধুনিক ও স্পোর্টস মডেলের অনেক মোটরসাইকেলের সামনের অংশে প্রচলিত নম্বরপ্লেট স্থাপনের নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় প্রশ্ন ওঠে। কারও কারও আশঙ্কা ছিল, প্লেট বসাতে বাইকের কাঠামো পরিবর্তন করতে হতে পারে। এতে নকশা ও সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বায়ু চলাচল, হেডলাইট বা ইন্ডিকেটরের দৃশ্যমানতা এবং চালানোর নিরাপত্তায় প্রভাব পড়তে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। কয়েকজন মোটরসাইকেলচালক তাঁদের বাইকের সামনে প্লেট বসানোর জায়গা নেই এমন ভিডিও প্রকাশ করেন। কেউ কেউ নম্বরপ্লেট দড়ি দিয়ে বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান।

বাইকারদের আপত্তির আরেকটি বড় জায়গা ছিল বাড়তি খরচ। পেছনে বিআরটিএ অনুমোদিত ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকার পরও সামনে আলাদা প্লেট তৈরির দায়িত্ব মালিকদের ওপর দেওয়ায় প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া দেশের সব এলাকায় এআই ক্যামেরার পর্যাপ্ত উপস্থিতি না থাকলে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন কেউ কেউ।

এ বিষয়ে পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও ভিন্নমত দেখা যায়। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রশ্ন তুলেছেন, আগে থেকে থাকা আরএফআইডি প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে নতুন করে নম্বরপ্লেট ও ক্যামেরাভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা কতটা যৌক্তিক। তাঁর মতে, এতে একদিকে মোটরসাইকেল মালিকদের বাড়তি ব্যয় হতে পারে, অন্যদিকে ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো স্থাপনে সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত

বাধ্যতামূলক নির্দেশনা বাস্তবায়নে নির্ধারিত সময় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচনায় থাকে। এ পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নম্বরপ্লেট স্থাপনের বাস্তবতা বিবেচনায় সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় বিআরটিএ।

২৯ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্যে বিআরটিএর চেয়ারম্যানের একটি বিবেচনাপত্রের বরাতে জানানো হয়, দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা প্রায় ৬৮ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় ৫০ লাখ, যা মোট নিবন্ধিত যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ। এত বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেলে অল্প সময়ের মধ্যে সামনের নম্বরপ্লেট স্থাপন করা কঠিন, এ যুক্তিতে ১৫ নভেম্বরের পরিবর্তে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়।

পরে বিআরটিএর বিজ্ঞপ্তিতে সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা জানানো হয়। ফলে মোটরসাইকেল মালিকেরা নম্বরপ্লেট স্থাপনের জন্য আরও দেড় মাসের বেশি সময় পান। তবে সময় বাড়লেও সামনের নম্বরপ্লেট প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা বহাল থাকে।

নতুন বিধিমালায় কী ধরনের ছাড়

সময়সীমা বাড়ানোর কয়েক দিনের মধ্যেই নম্বরপ্লেটের নকশা ও স্থাপনসংক্রান্ত বিধিগত জটিলতা দূর করতে আরও এক ধাপ এগিয়েছে সরকার। ১ নভেম্বর বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় সড়ক পরিবহণ বিধিমালা, ২০২২ সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ১২২ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বিধিমালার ৩৬ নম্বর বিধিতে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত বিধান অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

নতুন বিধানে মোটরসাইকেলের সামনের নিবন্ধন নম্বর প্রচলিত বিন্যাসের পাশাপাশি এক লাইনে বা আনুভূমিকভাবে প্রদর্শনের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলের নকশা ও কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একাধিক মাপের রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বরপ্লেট ব্যবহারের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, সামনের নম্বরপ্লেটের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের ক্ষমতা বিআরটিএকে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ অক্ষরের উচ্চতা, জেলা বা অঞ্চলের নাম নির্দেশকারী অক্ষরের মাপ এবং যানবাহনের শ্রেণি নির্দেশকারী অক্ষরের উচ্চতা নির্ধারণ করতে পারবে। এ ছাড়া প্লেটের নির্দিষ্ট অংশে ফাঁকা জায়গা, দুটি সংখ্যার মধ্যবর্তী ব্যবধান এবং নম্বরের মধ্যে ব্যবহৃত হাইফেনের দৈর্ঘ্যও ঠিক করতে পারবে।

এক লাইনে নম্বর লেখার ক্ষেত্রেও জেলা বা অঞ্চলের নাম এবং যানবাহনের শ্রেণি নির্দেশকারী অক্ষরের পর নির্ধারিত দৈর্ঘ্যের হাইফেন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আগে নির্ধারিত একটি মাপ ও বিন্যাসের ওপর নির্ভর না করে মোটরসাইকেলের গঠন অনুযায়ী বিকল্প আকার ও বিন্যাস অনুমোদনের আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া বিধিমালার ৩৬ নম্বর বিধির উপবিধি (১০) থেকে ‘মোটরসাইকেল এবং’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের ফলে মোটরসাইকেলের সামনের নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতার বিধিগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে নতুন সংশোধনীকে ইচ্ছেমতো নম্বরপ্লেট তৈরির অনুমতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নম্বরপ্লেটের মাপ, অক্ষরের উচ্চতা, ফাঁকা জায়গা ও বিন্যাস নির্ধারণের দায়িত্ব বিআরটিএর হাতে রাখা হয়েছে। ফলে বাইকের নকশা অনুযায়ী কিছুটা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলেও তা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মানদণ্ডের মধ্যেই থাকতে হবে।

বাধ্যবাধকতা বহাল, মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ

শুরুতে যে সিদ্ধান্ত বাইকারদের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটি বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে সরকার। প্রথমে নির্দিষ্ট মাপ ও নকশার নির্দেশনা, এরপর সময়সীমা বৃদ্ধি এবং সর্বশেষ বিধিমালা সংশোধন, পুরো প্রক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, মূল সিদ্ধান্ত বহাল রেখেই বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে।

এখন মোটরসাইকেল মালিকদের জন্য বড় বিষয় হলো, নিজ নিজ বাইকের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নম্বরপ্লেট কীভাবে স্থাপন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে বিআরটিএর পরবর্তী কারিগরি নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোন ধরনের মোটরসাইকেলের জন্য কী মাপ ও বিন্যাস অনুমোদিত হবে, তা স্পষ্ট হলে মালিকদের মধ্যে থাকা অনিশ্চয়তা আরও কমতে পারে।

সড়কে মোটরসাইকেল শনাক্তকরণ, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদার করার লক্ষ্যেই সামনের নম্বরপ্লেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এখন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে বাইকের নকশা, নিরাপত্তা ও মালিকদের বাস্তব অসুবিধার সমন্বয় করাই হবে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। ৩১ ডিসেম্বরের সময়সীমার মধ্যে এই পরিবর্তন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে উদ্যোগটির পরবর্তী অগ্রগতি।

এসএস
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১
E-mail: [email protected], [email protected]. [email protected], [email protected], [email protected], ‍[email protected], Online-email: [email protected]

🔝