২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ীর নাম জানা যাবে সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিবাগত রাতেই। ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিবেচনায় নিয়ে দেয়া হবে এই পুরস্কার। ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে কে জিতবেন ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার, সেটি নিয়ে শেষ মুহূর্তে চলছে জোর আলোচনা। এই ব্যাপারটি নিয়েই বিশ্লেষণ করেছে পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্বস্ত ফুটবল ওয়েবসাইট অপটা।
এবারের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় রয়েছেন তিন সাবেক বিজয়ী; ২০২৫ সালের জয়ী উসমান দেম্বেলে, ২০২৪ সালের বিজয়ী রদ্রি এবং রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী লিওনেল মেসি। তবে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জয়ের দৌড়ে কয়েকজনের সম্ভাবনাই তুলনামূলক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। আলোচনায় রয়েছেন চার তারকা; হ্যারি কেইন, লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলীয় সাফল্য এবং বিশ্বকাপের অবদান; সব মিলিয়ে তাদের প্রত্যেকের সামনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ।
১. হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড): গোলের বন্যায় ব্যক্তিগত স্বীকৃতির অপেক্ষা
এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে হ্যারি কেইনকে এগিয়ে রাখছে তার অসাধারণ গোলসংখ্যা এবং ক্লাব পর্যায়ে সাফল্য। তবে বিশ্বকাপের বছরে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগ না জিতেও এই পুরস্কার জেতার চ্যালেঞ্জ থাকবে ইংলিশ অধিনায়কের সামনে।
বিশ্বকাপের বছরে সাধারণত বিশ্বকাপজয়ী কিংবা চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী খেলোয়াড়দের ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে এমন বছরে এই দুই শর্তের বাইরে থেকেও পুরস্কার জেতার নজির রয়েছে হ্রিস্টো স্তইচকভের ১৯৯৪ সালে এবং মেসির ২০১০ সালে। কেইন জিতলে সেই তালিকায় যোগ হবে আরেকটি নাম।
দলীয় সাফল্যের দিক থেকেও অবশ্য তার মৌসুমটি খারাপ ছিল না। বায়ার্ন মিউনিখকে বুন্দেসলিগা ও জার্মান কাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্ন পৌঁছায় সেমিফাইনালে। অন্যদিকে, কেইনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলেছে।
ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় ১৪ গোল করেন কেইন, যা কেবল কিলিয়ান এমবাপ্পের ১৫ গোলের চেয়ে কম। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা ছিল ছয়।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বায়ার্নের হয়ে ৫১ ম্যাচে কেইনের গোল ৬১টি। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলা অন্য কোনো ফুটবলার এই মৌসুমে তার চেয়ে বেশি গোল করতে পারেননি। একক ক্লাব মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ লিগে এর চেয়ে বেশি গোল করার নজির রয়েছে কেবল মেসির; ২০১১-১২ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ৭৩টি।
বুন্দেসলিগায় ৩৬ গোল করে দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতেন কেইন। ইউরোপের সর্বোচ্চ লিগ গোলদাতার এই পুরস্কার মেসি ছয়বার এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো চারবার জিতেছেন।
ইংল্যান্ডের কোনো ফুটবলার সর্বশেষ ২০০১ সালে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। সেবার পুরস্কারটি উঠেছিল মাইকেল ওয়েনের হাতে। এর আগে কেভিন কিগান ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে এবং ববি চার্লটন ১৯৬৬ সালে এই সম্মান অর্জন করেন।
টটেনহ্যাম ছেড়ে বায়ার্নে যোগ দেয়ার পর কেইনের ট্রফি জয়ের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি বেড়েছে ব্যক্তিগত অর্জনের সুযোগও। এবার ব্যালন ডি’অর জিততে পারলে তার ক্যারিয়ারে যোগ হবে এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
২. লামিনে ইয়ামাল (বার্সেলোনা ও স্পেন): বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য, ক্লাবেও দুর্দান্ত
হ্যারি কেইনের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী লামিনে ইয়ামাল। স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি বার্সেলোনার হয়ে দুর্দান্ত একটি মৌসুম কাটিয়েছেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড।
তবে বিশ্বকাপে তার ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান খুব একটা উজ্জ্বল ছিল না। আট ম্যাচে মাত্র একটি গোলে অবদান রাখেন ইয়ামাল। সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পেনের ৪-০ গোলের জয়ে তিনি করেছিলেন প্রথম গোলটি।
বিশ্বকাপে তার অবদান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ক্লাব ফুটবলে ইয়ামালের পারফরম্যান্স ছিল ব্যতিক্রমী। মাত্র ১৯ বছর বয়সে পা দেয়ার আগেই বার্সেলোনার হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪১টি গোলে অবদান রাখেন তিনি; ২৪ গোল এবং ১৭টি অ্যাসিস্ট।
তুলনাটি আরও চমকপ্রদ। বার্সেলোনার হয়ে এক মৌসুমে ৪১টি গোলে অবদানের এই মাইলফলক অর্জনের সময় মেসির বয়স ছিল ২১ বছর; ২০০৮-০৯ মৌসুমে প্রথমবারের মতো তিনি এমন কৃতিত্ব দেখান।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ২০ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড়দের মধ্যে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ইয়ামালের চেয়ে বেশি গোলে অবদান রাখতে পারেননি কেউ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়ান দিয়োমান্দের অবদান ছিল ২২ গোলে।
শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্ট নয়, সুযোগ তৈরিতেও এগিয়ে ছিলেন ইয়ামাল। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে লা লিগায় সর্বোচ্চ ১৭টি অ্যাসিস্ট এবং ১১৮টি সুযোগ তৈরি করেন তিনি। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে ওপেন-প্লে থেকে সুযোগ তৈরির সংখ্যায়ও শীর্ষে ছিলেন এই স্প্যানিশ তারকা; ১০৭টি।
বিশ্বকাপে ইয়ামালের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলেও তার সামগ্রিক অবদান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বার্সেলোনার আক্রমণে তার সৃজনশীলতা, ধারাবাহিকতা এবং গোল তৈরির ক্ষমতা তাকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম আলোচিত প্রার্থী করে তুলেছে।
এবার পুরস্কার না পেলেও ভবিষ্যতে ইয়ামাল যে ব্যালন ডি’অর জয়ের বড় দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন, তা নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে।
৩. কিলিয়ান এমবাপ্পে (রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্স): বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড, কিন্তু দলীয় সাফল্যে ঘাটতি
বিশ্বকাপে ফ্রান্স শিরোপা জিততে পারলে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম নিশ্চিত দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হার এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৬-৪ গোলের পরাজয় তার সেই সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে এমবাপ্পে ছিলেন অসাধারণ। বিশ্বকাপে ১০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। বিশ্বকাপে একাধিকবার গোল্ডেন বুট জেতা প্রথম খেলোয়াড়ও হয়েছেন ফরাসি তারকা।
এতেই শেষ নয়। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২-এ, যা প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০৩০ সালের পরবর্তী বিশ্বকাপের সময় তার বয়স থাকবে মাত্র ৩১ বছর। ফলে নিজের এই রেকর্ড আরও বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।
ক্লাব ফুটবলেও ২০২৫-২৬ মৌসুমে দুর্দান্ত ছিলেন এমবাপ্পে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করেন তিনি। লা লিগায় ২৫ গোল করে প্রতিযোগিতাটির সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। চ্যাম্পিয়নস লিগেও ১৫ গোল করে ছিলেন শীর্ষে।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে অন্তত ১,৫০০ মিনিট খেলা ফুটবলারদের মধ্যে প্রতি ৯০ মিনিটে পেনাল্টি ছাড়া গোলের হিসাবে কেইনের পরেই ছিলেন এমবাপ্পে। এই হিসাবে কেইনের গড় ছিল ০.৯৮, আর এমবাপ্পের ০.৭৫। তবে পেনাল্টি ছাড়া প্রত্যাশিত গোলের (এক্সপেক্টেড গোল বা xG) হিসাবে এগিয়ে ছিলেন এমবাপ্পে; প্রতি ৯০ মিনিটে ০.৬৮, যেখানে কেইনের ছিল ০.৬৩।
ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত মৌসুম কাটালেও দল হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। কোচ জাবি আলোনসোর অধ্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, আর আলভারো আরবেলোয়া দলকে সুপারকোপার বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো শিরোপা এনে দিতে পারেননি।
ব্যালন ডি’অরের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে পারলে ক্লাব পর্যায়ের সীমাবদ্ধতা অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পারতেন এমবাপ্পে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
৪. লিওনেল মেসি (ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনা): নবম ব্যালন ডি’অর কি সম্ভব?
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আটবার পুরস্কার জেতার রেকর্ড লিওনেল মেসির। এবার কি নবমবারের মতো এই সম্মান অর্জন করবেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি? সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে তার ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স, দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রভাব এবং আবেগের বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।
আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেসি। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আসরে আটটি গোল করেন তিনি, যা তার দলের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও চারটি গোল করান।
বিশ্বকাপে মোট ১২টি গোলে অবদান রেখে মেসি ছিলেন প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা পারফরমার। তার চেয়ে বেশি গোলে অবদান রেখেছেন কেবল এমবাপ্পে; ১৪টি। সুযোগ তৈরিতেও মেসি ছিলেন সবার ওপরে। পুরো টুর্নামেন্টে ২৫টি সুযোগ তৈরি করেন তিনি।
তবে ফাইনালে ফের হতাশ হতে হয় আর্জেন্টিনাকে। অতিরিক্ত সময়ে ফেররান তোরেসের গোলের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে দলটি। বিশ্বকাপ জিততে পারলে মেসির ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা আরও জোরালো হতে পারত।
ক্লাব পর্যায়েও দারুণ কার্যকর ছিলেন মেসি। ইন্টার মায়ামির হয়ে এমএলএসে মাত্র ৩০ ম্যাচে ৫২টি গোলে অবদান রাখেন তিনি; ২৯ গোল এবং ২৩টি অ্যাসিস্ট। এই সময়ে প্রতিযোগিতাটির সর্বোচ্চ গোলদাতা ও অ্যাসিস্টদাতাও ছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা। এ ছাড়া এমএলএসে মোট সুযোগ তৈরি এবং ওপেন-প্লে থেকে সুযোগ তৈরির হিসাবেও সবার ওপরে ছিলেন মেসি। যথাক্রমে ৯৭টি ও ৭৮টি সুযোগ তৈরি করেন তিনি।
তবে ব্যালন ডি’অরের ভোটে এমএলএসের পারফরম্যান্স ইউরোপের শীর্ষ প্রতিযোগিতাগুলোর মতো গুরুত্ব পায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেসির মনোনয়নে তার বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘদিনের শ্রেষ্ঠত্বের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হলেও আর্জেন্টিনার শিরোপা না পাওয়া তার সম্ভাবনাকে সীমিত করতে পারে।
টিআই