গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে চুমু দেওয়ার অভিযোগে খণ্ডকালীন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় ‘ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায়’ হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মারধর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন ও সমাবেশ করেছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।
টঙ্গীর সফিউদ্দিন সরকার একাডেমি রোডে মাদরাসার নিজস্ব ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে অভিযোগের বিচার নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বক্তারা বলেন, শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি হামলা, ভাঙচুর ও অর্থ লুটের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঘটনার দিন ছাত্রীটির অভিভাবক শাহজালাল রুমি ১০ থেকে ১৫ জন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেন। এ সময় অধ্যক্ষের কক্ষের কাচ ও বৈদ্যুতিক বোর্ড ভাঙচুর করা হয়। খণ্ডকালীন শিক্ষক মো. মোসলেম উদ্দিনকে মারধর করে আহত করা হয়। এ ছাড়া অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা, উপাধ্যক্ষ ও নিরাপত্তাপ্রহরীকেও মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জমি কেনার জন্য ড্রয়ারে রাখা নগদ ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাওলানা ক্বারী মো. আলমাছ হোসেন গাজীপুরী দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরায় ঘটনার ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ঘটনায় টঙ্গী পশ্চিম থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার বাদী ছাত্রীটির বাবা। মামলায় প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে চুমু দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে খণ্ডকালীন শিক্ষক মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে। তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ছাত্রীকে চুমু দেওয়ার অভিযোগে আইন অনুযায়ী মামলা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মাদরাসায় হামলা, ভাঙচুর, মারধর ও ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ পৃথক মামলা করেছেন। ওই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা চলছে।
অধ্যক্ষ আলমাছ হোসেন গাজীপুরী বলেন, মোসলেম উদ্দিন একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষে পড়ছেন। তিনি খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা ক্লাস নিতেন। তাঁকে উপাধ্যক্ষ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, যা সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। উপাধ্যক্ষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে থাকায় ঘটনার সময় মাদরাসায় উপস্থিত ছিলেন না বলেও জানান অধ্যক্ষ।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে ধর্ষণ ও বলাৎকার হিসেবে প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। তাঁদের মতে, অনুমাননির্ভর প্রচারের পরিবর্তে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনা প্রয়োজন।
এদিকে, শানে সাহাবা খতিব ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠনের নেতারাও মাদরাসায় হামলা ও মব সৃষ্টির নিন্দা জানিয়েছেন। ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুফতি শামীম মজুমদার বলেন, তদন্তে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে মাদরাসায় হামলা চালানোও অন্যায়। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানান।
পুলিশ জানিয়েছে, শিক্ষকের বিরুদ্ধে করা মামলা এবং মাদরাসায় হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগে করা মামলাটি পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
-টিএস/রফিক