ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
রাইডারদের ক্ষোভ ও রেস্তোরাঁ মালিকদের বর্জন: বহুমুখী সংকটে ফুডপান্ডা
✎ অবজারভার প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৮ পিএম আপডেট: ১৯.১০.২০২৬ ১:৪৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘ফুডপান্ডা’-র মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দিনরাত কাজ করছেন হাজার হাজার রাইডার। তবে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত পারিশ্রমিক না পাওয়া, একতরফা পেনাল্টি এবং পেশাগত নিরাপত্তার অভাবে প্ল্যাটফর্মটির রাইডারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাইডারদের এই চরম অসন্তোষের পাশাপাশি পার্টনার রেস্তোরাঁ মালিকদের সেবা বর্জন, গ্রাহকদের অব্যাহত ভোগান্তি এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে পড়েছে ফুডপান্ডা।

দিনভর খাটুনি, দিনশেষে খালি হাত

ফুডপান্ডার ডেলিভারি কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত রাইডারদের প্রধান অভিযোগ, রোদ-বৃষ্টি, যানজট ও সড়কের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করার পরও তাদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত হচ্ছে না। রাইডারদের পারিশ্রমিক থেকে মোটরবাইক বা বাইসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি তেল এবং মোবাইল ডেটার বিপুল খরচ বাদ দেওয়ার পর দিনশেষে হাতে সামান্য টাকাই অবশিষ্ট থাকে।

তদুপরি, দূরত্বের তুলনায় নামমাত্র ডেলিভারি চার্জ নির্ধারণ এবং ইনসেনটিভ বা বোনাস পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন ও জটিল শর্ত চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে রাইডারদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই পারিশ্রমিক দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানান তারা।

রাজধানীর মতিঝিল এলাকার রাইডার সৌরভ হোসেন তাঁর দৈনন্দিন আক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, “সারাদিন রাস্তায় ঘুরে অর্ডার ডেলিভারি করতে হয়। কিন্তু আয় থেকে জ্বালানি, মোবাইল ডেটা ও মোটরসাইকেল রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাদ দিলে হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না। দূরত্ব ও কাজের চাপ অনুযায়ী ডেলিভারি চার্জ নির্ধারণ করা এবং রাইডারদের সংসার চালানোর মতো আয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

একতরফা পেনাল্টি ও অ্যাকাউন্ট সাসপেনশন

পারিশ্রমিকের পাশাপাশি অন্যায্য পেনাল্টি এবং অ্যাকাউন্ট স্থগিত (সাসপেনশন) করার কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে রাইডারদের মাঝে। তাদের অভিযোগ, অর্ডার বাতিল হওয়া, ডেলিভারিতে সামান্য দেরি হওয়া কিংবা গ্রাহকের অসন্তোষের মতো ঘটনায় কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই একতরফাভাবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অথচ শহরের তীব্র যানজট, রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরিতে বিলম্ব কিংবা গ্রাহকের সঠিক অবস্থান খুঁজে না পাওয়ার মতো অনেক পরিস্থিতির ওপর রাইডারদের কোনো হাত থাকে না।

এ বিষয়ে জাহিদ ইসলাম নামে এক রাইডার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “যানজট বা রেস্তোরাঁয় খাবার প্রস্তুত হতে দেরি হলে সব সময় আমাদের কিছু করার থাকে না। কিন্তু ডেলিভারি দিতে দেরি হলে এর দায় রাইডারকে নিতে হয়। যেকোনো অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে রাইডারের বক্তব্য শোনা এবং নিরপেক্ষভাবে ঘটনা যাচাই করার সুযোগ থাকা জরুরি।”

নেই চিকিৎসা ও পেশাগত নিরাপত্তা

কাজের সুবিধার চেয়ে ঝুঁকিয়েই বেশি দেখছেন রাইডাররা। তাদের অভিযোগ, বিপজ্জনক সড়কে কাজ করতে গিয়ে কোনো রাইডার দুর্ঘটনায় পড়লে চিকিৎসার পুরো খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়। তদুপরি, আঘাত বা অসুস্থতার কারণে কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলে সরাসরি আয় হারানোর চরম ঝুঁকিতে পড়তে হয় তাদের।

চট্টগ্রামের রাইডার সবুজ হোসাইন জানান, “রোদ-বৃষ্টি, যানজট ও সড়কের ঝুঁকি নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। দুর্ঘটনায় চিকিৎসার খরচ ও কাজ বন্ধ থাকায় আয় কমে যায়। এ জন্য রাইডারদের দুর্ঘটনাবিমা, জরুরি সহায়তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”

অসন্তোষ ছড়িয়েছে রেস্তোরাঁ মালিকদের মধ্যেও

রাইডারদের পাশাপাশি ফুডপান্ডার একচেটিয়া কমিশন নীতি ও অন্যায্য চার্জ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ পার্টনার রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তাদের অভিযোগ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে বিক্রির পরিমাণ বাড়লেও চড়া কমিশন, প্রিমিয়াম প্লেসমেন্ট, বিজ্ঞাপন ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ মিটিয়ে তাদের প্রত্যাশিত মুনাফা হচ্ছে না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেস্তোরাঁগুলোর জন্য এসব বাড়তি ব্যয় সামলে ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রেস্তোরাঁ মালিকেরা জানিয়েছেন, চুক্তির মূল কমিশনের বাইরেও প্রচার-প্রচারণা ও বিভিন্ন ডিসকাউন্ট অফারে অংশ নেওয়ার নামে অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দিনশেষে বিক্রি বাড়লেও প্রকৃত মুনাফার অঙ্ক খুবই কম থাকে। এছাড়া পেমেন্ট ছাড় ও ইনভয়েসের হিসাব-নিকাশেও অস্পষ্টতা রয়েছে।

যদিও ফুডপান্ডার সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় চুক্তির সময়েই কমিশন নির্ধারণের কথা বলা হয়, তবে ব্যবসায়ীদের দাবি—কমিশনের বাইরে বিভিন্ন সেবামূলক ফি যুক্ত হওয়ার কারণে তাদের প্রকৃত আয় হিসাব করা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবাদে চট্টগ্রামে ফুডপান্ডা বয়কট

কমিশন ও বাড়তি চার্জের প্রতিবাদে চট্টগ্রামজুড়ে ফুডপান্ডার সেবা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি (চট্টগ্রাম মহানগর)। ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় সংশ্লিষ্ট সব রেস্তোরাঁকে ফুডপান্ডার অর্ডার নেওয়ার ট্যাব বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৫ অক্টোবরের পরিবর্তে ৬ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।

সংগঠনটির নেতারা জানান, কমিশন ও চার্জ কমানোর সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো লিখিতভাবে ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সমাধান জানানোর কথা বলেছিল। সমাধান না আসায় কর্মসূচি আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারি দেন ব্যবসায়ীরা।
রিফান্ড ও সেবা ভোগান্তিতে গ্রাহকরাও

রাইডার ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যেও ফুডপান্ডার সেবা নিয়ে নানা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। খাবার পৌঁছাতে অতিরিক্ত দেরি, ভুল অর্ডার সরবরাহ, আগাম টাকা কেটে নেওয়ার পরও খাবার না পাওয়া এবং হঠাৎ অর্ডার বাতিলের মতো অভিযোগে গ্রাহকসেবার মান প্রশ্নের মুখে। অ্যাপে যে সম্ভাব্য সময় দেখানো হয়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি অপেক্ষা করতে হওয়ায় ঠান্ডা ও মানহীন খাবার পৌঁছায় বলে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি।

তবে ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষের মতে, অ্যাপের সময়সীমাটি আনুমানিক। যানজট, দূরত্ব, খারাপ আবহাওয়া কিংবা একই রাইডারের একাধিক ডেলিভারির কারণে সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে।

তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, অর্ডারে কোনো সমস্যা হলে দ্রুত কাস্টমার সাপোর্ট পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ভুল বা বাতিল অর্ডারের টাকা ফেরতের (রিফান্ড) প্রক্রিয়াতেও রয়েছে জটিলতা। ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংকে অর্থ ফেরত আসতে দীর্ঘ সময় লাগে, আবার অনেক সময় গ্রাহককে না জানিয়েই সেই টাকা সরাসরি অ্যাপের ওয়ালেটে জমা করে দেওয়া হয়।

ভোক্তা অধিদপ্তরের পদক্ষেপ

সেবা সংক্রান্ত এসব অনিয়ম ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর পর্যন্ত বিষয়টি গড়ায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে অধিদপ্তর। বৈঠকে দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, যথাসময়ে সঠিক পণ্য সরবরাহ এবং ব্যর্থ হলে সময়মতো অর্থ ফেরত দেওয়া বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অর্থ আত্মসাতের মামলায় শীর্ষ ৫ কর্মকর্তার নামে পরোয়ানা

সার্বিক ব্যবসায়িক ও সেবামূলক অচলাবস্থার মাঝেই ফুডপান্ডা বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা কোটি টাকার মামলা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ফুডপান্ডা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দা আমবারীন রেজাসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

পরোয়ানাভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন—সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক জুবায়ের সিদ্দিকী, পান্ডামার্টের পরিচালক মো. তাবরেজ খান, হেড অব ক্যাটাগরি দিলারা ফারুক এবং সিনিয়র ম্যানেজার মোহাম্মদ সাজেদুল হক।

‘প্রোটিন অ্যান্ড পেরিশেবল’ নামক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শিহাব মাহমুদ বশিরের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, ফুডপান্ডার সহযোগী ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম পান্ডামার্টে পণ্য সরবরাহের বিপরীতে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা পাওনা অর্থ পরিশোধ না করে অনিয়ম করা, ভুয়া চালান তৈরি এবং অন্যায্যভাবে অর্থ কেটে নেওয়া হয়েছে। তবে আনীত এসব অভিযোগ আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষ।

ফুডপান্ডার অবস্থান ও জামিন

সার্বিক অভিযোগ অস্বীকার করে ফুডপান্ডার মূল বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগী সংস্থা 'ডেলিভারি হিরো স্টোরস (বাংলাদেশ)' জানিয়েছে, এটি মূলত দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ এবং তাদের কর্মকর্তারা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। তারা আরও জানায়, পরোয়ানাভুক্ত সংশ্লিষ্ট পাঁচ কর্মকর্তা ইতোমধ্যে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন লাভ করেছেন।


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement