দেশের অন্যতম আলোচিত মেগা প্রকল্প কর্ণফুলী টানেলের বিপুল আর্থিক লোকসান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। একই সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদগুলোতে শুধু পদ পূরণ নয়, সুপরিকল্পিত কর্মভার (স্ট্র্যাটেজিক লোড) নির্ধারণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা গৃহীত হয়। সংসদ সচিবালয় থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিগত সভার কার্যবিবরণী কিছু প্রয়োজনীয় সংশোধনী সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে দৃঢ়ীকরণ করা হয়। এরপর পূর্ববর্তী বৈঠকের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চলমান ১ হাজার ১৫৩টি প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কমিটির সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। এসব প্রকল্পের জন্য গৃহীত পাঁচ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র তুলে ধরে বর্তমানে প্রকল্পগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সে বিষয়ে কমিটিকে বিস্তারিত অবহিত করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংসদ সচিবালয় জানায়, বৈঠকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দেশের ২৫৬টি প্রকল্পের মেয়াদ কেন বাড়ানো হলো- তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পেশ করেছে মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই কাজ শুরু করার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়। এ ছাড়া, সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়া এবং একাধিক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতাকে প্রকল্প পিছিয়ে পড়ার জন্য দায়ী করা হয়। বৈঠক থেকে উন্নয়ন প্রকল্পের এসব দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে সব সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জোরালো সুপারিশ করা হয়।
প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের চলমান সংকট নিরসনে একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে বৈঠকে সংসদীয় কমিটিকে অবহিত করা হয়। এ সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত রূপ পেলে প্রকল্প পরিচালক নির্বাচন ও পদায়নে যে জটিলতা রয়েছে, তার গুণগত সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। পাশাপাশি, দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য দূর করার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে দেশের সব গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও শূন্য পদের বিষয়ে বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানানো হয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের ২২১টি শূন্য পদের বিপরীতে বিভিন্ন গ্রেডে ৬৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল পদ পূরণ না করে স্ট্র্যাটেজিক লোড বা সুপরিকল্পিত কর্মভার সঠিকভাবে নির্ধারণ করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ সম্পন্ন করার বিশেষ নির্দেশনা দেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল দেশের আলোচিত মেগা প্রকল্প কর্ণফুলী টানেল। টানেলটির প্রাথমিক ফিজিবিলিটি স্টাডি, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং এর বর্তমান বিপুল আর্থিক লোকসানের কারণগুলো নিয়ে বৈঠকে ব্যাপক আলোচনা হয়। এসব বিষয়ের গভীরে গিয়ে তদন্তের লক্ষ্যে পরবর্তী বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে, কর্ণফুলী টানেল সম্পর্কিত প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন এবং লোকসানের নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে কাজ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত এই দ্বিতীয় বৈঠকে কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, কাজী রফিকুল ইসলাম, মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম এবং মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এ ছাড়া, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা, পরিকল্পনা বিভাগ এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিবদ্বয়, মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধান এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
টিআই