ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ছে। বেকারত্ব, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণসহ নানা ইস্যুতে রাজপথে নামছেন তরুণেরা। নিরাপত্তার জন্য বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও গত সপ্তাহে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড টপকে সরকারবিরোধী স্লোগান দেন এবং তাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান।
এক তরুণকে পুলিশ বাসে তোলার সময় তাকে ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বলে স্লোগান দিতে শোনা যায়।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) প্রজেক্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ভারতে গত এক দশকের যেকোনো বছরের তুলনায় বেশি সড়কবিক্ষোভ হতে পারে। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ার পাশাপাশি জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের তরুণদের বিক্ষোভে অংশগ্রহণও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের বিক্ষোভ এবং বিরোধীদের প্রতি বাড়তে থাকা সমর্থন ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোদীর জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। ভারতের প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। তবে এখনো মোদী সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় কোনো সংকেত নেই এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে হওয়ার কথা।
সরকারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন, দেশ হঠাৎ করেই নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে ক্ষোভ, বড় হচ্ছে আন্দোলন
সম্প্রতি রাজধানী দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে। ভোটার তালিকা সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক চলছে, আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এর ফলে বিজেপি সুবিধা পেয়েছে এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে দলটির জয়ে ভূমিকা রেখেছে।
তবে বিজেপি, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির দাবি, মোদীর জনপ্রিয়তা ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণেই দলটি নির্বাচনে জয় পেয়েছে।
তবে আন্দোলন শুধু নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। গত ১২ বছরে ভারতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়লেও লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় মোদির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে।
চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের উচ্চ হার এবং মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার অভিযোগে আলোচিত ধনকুবের ব্যবসায়ীদের উত্থানও সরকারবিরোধী মনোভাব জোরালো করেছে।
মোদীর ভাবমূর্তি একজন কঠোর শাসকের। তার সরকার অতীতে বিভিন্ন বিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করেছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ তরুণ বিক্ষোভকারীদের দমাতে পারেনি।
শনিবার দিল্লির বড় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অনন্যা রাতুরি বলেন, আমাদের মধ্যে আর ভয় নেই।
বিক্ষোভকারীদের আটক করতে পুলিশের ব্যবহৃত একটি বাসের উইন্ডশিল্ড ওয়াইপারের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে থাকার পর তিনি বলেন, আটক হওয়া বা পুলিশের মারধরের ভয় আমরা করি না। এই প্রজন্ম এটা উপভোগ করে।
তবে বিক্ষোভে পুলিশ মারধর করেছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। তাদের দাবি, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই বিক্ষোভকারীদের সামলানো হয়েছে।
‘ককরোচ জেনতা পার্টি’র উত্থান
মোদি সরকারের আমলে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত প্রথম তরুণনেতৃত্বাধীন আন্দোলন হিসেবে সামনে এসেছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। অনলাইন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ থেকে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন গত জুনে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকারদের ‘তেলাপোকা’ বলে তুলনা করার পর এ আন্দোলন নতুন গতি পায়।
সমালোচকদের অভিযোগ, ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ সরকারপন্থী এবং তারা বিক্ষোভের খবর তুলনামূলক কম প্রচার করছে। তবে মোবাইল ফোন হাতে হাজারো বিক্ষোভকারী এবং ইউটিউবের স্বাধীন সংবাদমাধ্যমগুলো আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ও বামপন্থী কর্মী নেহা বোরার মতো নেতারা অনলাইনে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন।
মোদির শাসনামলে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া বিরোধী দলগুলোও নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও হাজার হাজার সমর্থক নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
ভারতের এই অস্থিরতার সঙ্গে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনের তুলনা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওই দুই দেশে তরুণদের আন্দোলনে সরকার পতনের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মোদির জনপ্রিয়তার কারণে এই তুলনা পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ মোদীর ক্ষমতায় উত্থানের সময় বেড়ে উঠেছেন। তখন তাঁদের সামনে কর্মসংস্থান, সুযোগ সৃষ্টি ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এক দশক পর তাঁদের অনেকেরই অভিযোগ, সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং হিন্দুত্ববাদী সরকার ধর্মীয় ইস্যু ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিভাজনমূলক রাজনীতিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
সরকার অবশ্য আগে জানিয়েছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে অর্থনীতিতে ১৬ কোটি ৮৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। মোদী বারবার বৈষম্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তার সরকার সব ভারতীয়ের জন্য কাজ করে।
কলকাতার ৩০ বছর বয়সী মেডিকেল শিক্ষার্থী গৌরী শেঠ ২০১৪ সালে ভোটার হন। ওই বছরই মোদী সরকার ক্ষমতায় আসে।
গৌরী বলেন, মোদী সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা পূরণ করতে পারেনি।
তার অভিযোগ, এর বদলে তারা ধর্মীয় অবকাঠামোর মতো বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। কেউ সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বা দেশবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে বেকারত্ব
ক্ষমতায় আসার সময় প্রতি বছর লাখ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদী। কিন্তু ভারতের অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বেকারত্বের হার এখনো ৫ শতাংশের কিছু বেশি।
গত বছরের রয়টার্সের একটি জরিপে বলা হয়, এই পরিসংখ্যানে বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি উঠে আসে না, বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে। ২০২৫ সালে ভারতের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৩৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ।
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। আর ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের প্রতি পাঁচজনে প্রায় একজন বেকার।
চলতি বছরের মে মাসে দেশজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে, যখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকার জাতীয় মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা বাতিল করে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণদের কাছে এসব পরীক্ষা ছিল ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ।
দিল্লির ৩০ বছর বয়সী সমাজকর্মী রুবি সিং বলেন, বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের মধ্যে এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে যে বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও তাঁরা সুযোগ পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, এই প্রজন্ম মানসম্মত শিক্ষার অভাবে ভুগছে। ফলে ভালো সুযোগ পাওয়ার পথও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।’
জাতীয় নির্বাচন হতে এখনো প্রায় তিন বছর বাকি। তবে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে আগামী বছরের শুরুর দিকে নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচন মোদির জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হতে পারে।
তবে নির্বাচনে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা এখনই নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না।
নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক রাহুল ভার্মা বলেন, কয়েক মাস আগের তুলনায় বিজেপি হয়তো এখন ততটা শক্তিশালী অবস্থানে নেই। তবে এর ফলে নির্বাচনে কী প্রভাব পড়বে, তা বলার সময় এখনো আসেনি।
সূত্র: রয়টার্স