
সংগৃহীত ছবি
জিবুতি থেকে ইয়েমেন যাওয়ার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি নৌকা ডুবে অন্তত ১৩৯ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৫টি শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় আরও ৮৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জাতিসংঘের একটি সংস্থা রোববার জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক বিবৃতির বরাতে নাইরোবি থেকে এএফপি জানায়, ৩০৫ জন যাত্রী নিয়ে নৌকাটি গত ৮-৯ অক্টোবর রাতে জিবুতির ওবক শহরের উত্তরে উল্টে যায়। যাত্রীদের অধিকাংশই ইথিওপীয় নাগরিক ছিলেন।
জিবুতিতে আইওএমের মিশনপ্রধান আলেক্সান্দ্রে কোয়িসাক এএফপিকে বলেন, ‘বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা আমাকে জানিয়েছেন, নৌকায় ওঠার পরপরই সেটি পেছনের দিকে ডুবতে শুরু করে।’
বিবৃতিতে এর আগে তিনি বলেন, ‘এটি প্রাণহানির এক ভয়াবহ ঘটনা।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা বেঁচে ফিরেছেন এবং যারা স্বজন হারিয়েছেন কিংবা এখনও তাদের স্বজনদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না, তাদের সবার প্রতি আমাদের সমবেদনা।’
আইওএম প্রথমে ১০৯ জনের মৃত্যু ও ১১৬ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য দিয়েছিল। পরে আরও মরদেহ উদ্ধারের পর সংস্থাটি সংশোধিত বিবৃতিতে জানায়, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩৯ এবং নিখোঁজের সংখ্যা কমে ৮৪ হয়েছে।
কোয়িসাক বলেন, জরুরি সহায়তা দিতে আইওএমের দল জিবুতির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘটনাস্থলে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে বাব আল-মান্দেব প্রণালি পেরিয়ে ইয়েমেনে এবং সেখান থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে এই অভিবাসনপথে মানুষ কী ধরনের বিপদের মুখোমুখি হন, এ মর্মান্তিক ঘটনা তারই নির্মম স্মারক।’
কোয়িসাক জানান, নৌকাডুবিতে বেঁচে যাওয়া একজনের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। ওই ব্যক্তি উত্তর ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চলের বাসিন্দা। সেখানে সাম্প্রতিক সহিংসতা বৃদ্ধির মধ্যে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের লড়াই চলছে।
আইওএমের প্রাথমিক বিবৃতি অনুযায়ী, এর আগে উদ্ধার করা ১০৯টি মরদেহের মধ্যে ৫২ জন পুরুষ, ৪২ জন নারী ও ১৫টি শিশু ছিল। শিশুদের মধ্যে নয়জন মেয়ে ও ছয়জন ছেলে।
সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, নৌকাডুবিতে বেঁচে যাওয়া ৮২ জনই ইথিওপীয় নাগরিক।
আইওএম বলেছে, ‘দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব অনেক মানুষকে এই বিপজ্জনক যাত্রায় নামতে বাধ্য করছে, যদিও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে।’
সংস্থাটি জানায়, ওবকের একটি অভিবাসী কেন্দ্রে ৬৪ জন বেঁচে ফেরা ব্যক্তিকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় জিবুতির কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।’
আইওএম এই ঘটনাকে ওই অভিবাসনপথে নথিভুক্ত ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী নৌকাডুবির ঘটনাগুলোর একটি’ বলে উল্লেখ করেছে।
আইওএমের মুখপাত্র কেনেডি ওমোন্দি ওকোথ এ সপ্তাহে এএফপিকে বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইথিওপিয়া থেকে ১ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ জিবুতিতে পৌঁছেছেন।
তিনি জানান, ইয়েমেনে সংঘাত বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ইথিওপিয়া থেকে জিবুতিতে ২০ হাজারের বেশি মানুষের সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনা শনাক্ত করেছে আইওএম।
সৌদি আরব-সমর্থিত সরকার ও ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াইয়ে ইয়েমেন বিপর্যস্ত। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চলমান আঞ্চলিক সংঘাতেও হুতিরা যোগ দিয়েছে।
কোয়িসাক বলেন, জিবুতির উপকূলে ডুবে যাওয়া নৌকাটির ১৫০ জন যাত্রীকে এর আগে ইয়েমেন থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও তারা আবার সমুদ্রপথে যাত্রার চেষ্টা করেন।
ইথিওপীয় ও সোমালীয় অভিবাসী
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইয়েমেন যাওয়ার সমুদ্রপথে ৯০০ জনের বেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয় অথবা তারা নিখোঁজ হন। ওই বছর এ পথে যাত্রার চেষ্টাও ১৮ শতাংশ বেড়েছিল।
২০২৬ সালের মার্চে আরেকটি নৌকাডুবিতে নয়জনের মৃত্যু হয় এবং ৪৫ জন নিখোঁজ হন।
ওকোথ বলেন, এ পথে যাত্রার চেষ্টাকারীদের অধিকাংশই ইথিওপিয়া অথবা সোমালিয়ার নাগরিক।
তিনি বলেন, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত জিবুতিতে ‘আটকে পড়ছেন’।
আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কেউই এমন নৌকায় ওঠেন না, যদি না তিনি বিশ্বাস করেন যে নিরাপদে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এই মৃত্যুগুলোকে আর স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না। নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনপথ মানুষের জীবন বাঁচায়। পরবর্তী নৌকাটি ডুবে যাওয়ার আগেই আমি সরকার ও দাতাদের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
আইওএম জিবুতির অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং জীবন রক্ষাকারী সহায়তাসহ দেশটির কার্যক্রমে সহায়তা বাড়াতে ‘দাতা সংস্থা ও অংশীদারদের’ প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
টিআি