ভারতের দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে ব্যাপক ধরপাকড়ের শিকার হওয়ার পর দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির নেতারা বলেছেন, নির্বাচন জালিয়াতির অভিযোগের প্রতিবাদে তাদের আন্দোলন থামবে না। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিক্ষোভ চলবে।
রোববার (১১ অক্টোবর) দিল্লি পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, লড়াই সবে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই বিক্ষোভ থামবে না।
সিজেপি নেতা সৌরভ দাসও আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, শুধু দিল্লিতে নয়, ভারতের সর্বত্র বিক্ষোভ হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন তিনি।
এর আগে শনিবার (১০ অক্টোব) যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করতে চেয়েছিলেন সিজেপির নেতাকর্মীরা। তাদের ঠেকাতে দিল্লিজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে পুলিশ। এসময় রাজনীতিকসহ অন্তত তিন হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। কোনো কোনো হিসাবে আটকের সংখ্যা সাত হাজার পর্যন্ত বলা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশকে শনিবার রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়।
সিজেপির প্রধান অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে শনিবার সকালে মুম্বাই থেকে দিল্লি পৌঁছালে উড়োজাহজের ভেতর থেকেই আটক করা হয়। পরে তাদের প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয়।
রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে তাদের এক বছরের জন্য শান্তি ভঙ্গ না করার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তবে আটকের ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাঙ্কা। তিনি বলেন, উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছিল। মুক্তির শর্ত নিয়েও আপত্তি তুলেছে সিজেপি। দলটির বক্তব্য, কোনো নেতা ভবিষ্যতে বিক্ষোভ করবেন না- এমন মুচলেকায় সই করেননি।
মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দীপকে লেখেন, আমরা এমন কোনো মুচলেকায় সই করিনি, যেখানে বলা হয়েছে আমরা আর বিক্ষোভ করব না। আমরা আবার রাস্তায় নামবো।
সিজেপির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, শান্তি ভঙ্গ না করার শর্তের অর্থ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকা নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা সংবিধানস্বীকৃত অধিকার। রাঙ্কার অভিযোগ, শান্তি ভঙ্গ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও জ্ঞানেশ কুমার।
বিক্ষোভকারীদের জন্য যন্তর মন্তর খুলে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন নেতারা। তাদের অভিযোগ, রাজধানীর ওই নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলে যেতে বাধা দিয়ে কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করছে।
আটক অবস্থায় দাদির মৃত্যুর খবর যেভাবে অভিজিৎ দীপকেকে জানানো হয়েছে, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাঙ্কা। মুক্তি পাওয়ার পর দাদির শেষকৃত্যে অংশ নিতে মহারাষ্ট্রের নিজ শহরের উদ্দেশে রওনা হন সিজেপি প্রধান।
দলের আইনি সহায়তা বিভাগের প্রধান রত্না সিং অভিযোগ করেন, পুলিশ আন্দোলনকারীদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিয়েছে ও তাদের সন্তানদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বন্ধ করতে বলেছে। তার দাবি, গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা তার চলাফেরার ওপর নজরদারি করেছেন।
অধিকারকর্মীদের ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের ভিত্তি কী, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। রত্না সিং বলেন, আমি একজন নাগরিক। যে কোনো জায়গায় যাওয়ার অধিকার আমার আছে। আমাকে কীভাবে অন্যায়ভাবে আটক করে রাখা যায়?
‘জরুরি অবস্থার’ সঙ্গে তুলনা
দিল্লিতে গত ৭২ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহকে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন রাঙ্কা। তার দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি মানুষকে সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
রাঙ্কা বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদীর আমলে ট্রেন বাতিল করা হয়েছে, অথচ ১৯৭৫ সালেও ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়নি। সৌরভ দাসও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ‘জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি’ তৈরির অভিযোগ তোলেন। তার মতে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রতিনিধি দলকে আমন্ত্রণ জানাতে পারত সরকার।
শনিবারের (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। রেলওয়ে প্রায় ২৫০টি ট্রেনের চলাচল বাতিল করে। রাজধানীতে বিক্ষোভকারীদের জড়ো হওয়া ঠেকাতে নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলে পুলিশ।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও। শনিবার (১০ অক্টোবর) গভীর রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
রোববার কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, দিল্লিতে মেট্রো ও রেল চলাচল এখন স্বাভাবিক হয়েছে।
সৌরভ দাস দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে শিখদের পবিত্র স্থান গুরুদ্বার বাংলা সাহিবে জুতা পরে ও মাথা না ঢেকে প্রবেশ ও বিক্ষোভকারীদের জোর করে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও তোলেন। এ ঘটনায় শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের (এসএফআই) নেত্রী ঐশী ঘোষও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যন্তর মন্তর ২.০ শুরু হয়েছে। আমরা রাস্তায় আছি, রাস্তাতেই থাকবো, সংবিধান মেনেই চলবো।
তার অভিযোগ, বিজেপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে সিজেপির বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিজেপির পাল্টা অভিযোগ
এদিকে, সিজেপির আন্দোলনের সমালোচনা করেছে বিজেপি। দলটি সিজেপিকে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের একটি অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীন অভিযোগ করেছেন, ‘বিদেশি শক্তির’ নির্দেশে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সিজেপি ভারতের ক্ষতি করতে চাইছে।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত সিজেপিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ‘বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেছেন। শনিবার (১০ অক্টোবর) আটক হয়ে পরে মুক্তি পাওয়া চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর একজন ছিলেন কেজরিওয়াল। অন্যদিকে, রাহুল গান্ধীও কয়েক মাস ধরে একই ইস্যুতে বিক্ষোভ করে আসছেন।
তবে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, গণতন্ত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, নৈরাজ্য ছড়ানো কারও অধিকার নয়।
সূত্র: এনডিটিভি
টিআই