ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
মসজিদের মাইকে ঘোষণা ‘বাড়ি সরাতে হবে।’
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৮ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

 মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলেই একে অন্যের বাড়ি সরাতে ছুটে আসেন মানুষ । ঘোষণা শুনেই রাত-বিরাতের তোয়াক্কা না করে কারও হাতে বাঁশ, কারও হাতে দড়ি। কেউ খুলছেন ঘরের চাল, কেউ সরিয়ে নিচ্ছেন আসবাবপত্র। লক্ষ্য একটাই পদ্মার গ্রাস থেকে যতটুকু সম্ভব বাঁচিয়ে নেওয়া শেষ সম্বলটুকু।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাতীরবর্তী জনপদে এখন এটাই যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা।

নদী এগিয়ে আসছে, আর মানুষ পিছু হটছেন।

একবার, দুবার নয় মাত্র চার-পাঁচ বছরের ব্যবধানে অনেক পরিবারকে আট থেকে দশবার পর্যন্ত বসতভিটা সরাতে হয়েছে। ঘর হারানোর সঙ্গে হারিয়েছে জমি, ফসলি মাঠ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ হারিয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা স্মৃতি।

নদীর ভাঙনে বদলে গেছে পুরো এলাকার ভূগোল।

সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা, উজিরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক বছরে নদী ও ভাঙনের রেখা কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কোথাও বসতভিটা, কোথাও আবাদি জমি সবকিছু গিলে খাচ্ছে পদ্মা।

সাম্প্রতিক বন্যার পর নদীভাঙনে নারায়ণপুর, দুর্লভপুর, নামোজগন্নাথপুর, ফিল্ডেরহাট, কানছিড়া, যোগলাউড়ি ও ঝাইলপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় অন্তত ৮০০ পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

যাদের একসময় নিজস্ব ঘর ছিল, তাদের অনেকেই এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিচ্ছেন।

নদী শুধু ঘর নয়, কেড়ে নিচ্ছে জীবিকার জমিও

ভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমিও। একসময় যেখানে ধান, গম, সরিষা কিংবা ভুট্টার আবাদ হতো, সেখানে এখন বিস্তীর্ণ বালুচর।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, কয়েক বছরে পদ্মার গতিপথ ও তীরবর্তী এলাকার ভূপ্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নদীর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা তৈরি হওয়ায় কোথাও কোথাও এপার-ওপারের দূরত্বও বেড়েছে ব্যাপকভাবে।

পাকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মন্ডল বলেন, চারটি ইউনিয়নের মানচিত্রই যেন বদলে গেছে।

তিনি বলেন, নদীর পানি সরে যাওয়ার পর প্রায় চার হাজার একর জমিতে আবারও গম, সরিষা ও ভুট্টা চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বন্যা ও নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো কৃষকদের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। তাই দ্রুত সরকারি সহায়তায় বীজ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, পাকা ইউনিয়নের নিশিপাড়া, দক্ষিণ পাকা, ২০ রশিয়া, জ্যাকপাড়া ও দোভাগী এবং পার্শ্ববর্তী মনোহরপুর ও ফিল্ডেরহাটে গত কয়েকদিন ধরে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

শুধু পাকা ও আশপাশের এলাকাতেই প্রায় ৫০০ পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে দাবি তার।

এক রাতেই বদলে যায় ঠিকানা

ফিল্ডেরহাট এলাকায় দুলাল, রোজবুল, মান্নান, রফিক, সালাম, জিয়াউল ও বাবরসহ বহু মানুষের ঘরবাড়ি ইতোমধ্যে নদীতে চলে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুব আলম ও মোশাররফ হোসেনের কথায় উঠে আসে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব।

তাদের দাবি, নদীভাঙন ঠেকাতে দ্রুত প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ শুরু করতে হবে। ইতোমধ্যে বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তারা।

কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত পদ্মার ভাঙন থামবে কি না সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বাঁধ নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, নদীভাঙন রোধে ২৩ জন ঠিকাদারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীতীর রক্ষা ও বাঁধ নির্মাণের কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মধ্যে ১৬টি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ হাজার ৯৪০ মিটার বামতীর রক্ষা কাজ এবং সাতটি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার ডানতীর রক্ষা কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শেষ প্রশ্ন মানুষ যাবে কোথায়?

তবে প্রকল্প, বরাদ্দ আর বাঁধের হিসাবের বাইরে নদীতীরের মানুষের প্রশ্ন একটাই

আর কতবার ঘর ভাঙবে?  
আর কতবার নতুন করে বসতি গড়তে হবে?  
আর কত জমি হারালে থামবে পদ্মার ভাঙন?

মসজিদের মাইকে ঘোষণা এলেই যারা ছুটে আসেন অন্যের ঘর বাঁচাতে, তারাও জানেন আজ হয়তো তারা প্রতিবেশীর ঘর সরাচ্ছেন; কাল হয়তো সেই একই মানুষকে নিজের ঘর সরাতে ছুটতে হবে।

পদ্মার তীরে তাই নদী শুধু একটি জলধারা নয়। হাজারো মানুষের কাছে এটি প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা, হারানোর ভয় এবং নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রামের নাম।


 এফএস 
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement