খুলনার দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলায় পরপর দুই দিনে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গত রোববার দিঘলিয়ায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)-এর আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম (৫৫) এবং পরদিন সোমবার রূপসার দুর্জনীমহল গ্রামে বাসশ্রমিক আক্তার ঢালী (৫৮) গুলিতে নিহত হন।
পরপর দুই উপজেলায় দুই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের মধ্যে নিষিদ্ধ চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা আবারও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে দুটি ঘটনাকেই ‘টার্গেট কিলিং’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত রোববার বেলা পৌনে ১২টার দিকে দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে একটি দোকানে চা পান করার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম। ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পার হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের চেহারা স্পষ্ট দেখা গেছে। এরপরও তাদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে না পারায় পুলিশের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত এলাকাবাসী।
এ ঘটনায় সোমবার রাতে নিহত নাসিমের স্ত্রী সেলিনা খাতুন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা সাত-আটজনকে আসামি করে মামলা করেন।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ফরমাইশখানা এলাকায় ভৈরব নদকেন্দ্রিক জ্বালানি তেল পাচার চক্রের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে নাসিমের বিরোধ ছিল। এ ছাড়া স্থানীয় একটি গ্রুপের সঙ্গেও তাঁর দ্বন্দ্ব ছিল। এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েকদিন আগে খুলনার ‘ঠান্ডা পীর’ নামে পরিচিত এক শীর্ষ চরমপন্থীর ছেলের সঙ্গেও নাসিমের বিরোধের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। “আমরা এটাকে টার্গেট কিলিং হিসেবে দেখছি। ঘটনাস্থল থেকে ভিডিও ফুটেজসহ অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
মামলা প্রত্যাহারে হুমকির অভিযোগের পর খুন
নাসিম হত্যার একদিন পর সোমবার সন্ধ্যার পর রূপসার দুর্জনীমহল শহীদের মোড়ের ঢালী বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হন বাসশ্রমিক আক্তার ঢালী। মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি।
পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, গত ১৫ আগস্ট আক্তার ঢালীর বড় ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই হত্যা মামলার বাদী ছিলেন আক্তার ঢালী। এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়।
এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আক্তার ঢালী। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, হত্যা মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, “আপাতত এই বিষয়টিকেই কারণ হিসেবে সামনে রেখে আমরা তদন্ত করছি। এটাকেও টার্গেট কিলিং হিসেবে দেখা হচ্ছে। খুলনায় বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একজন পেশাদার খুনির সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”
জিডিতে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছিলেন আক্তার
২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় করা জিডিতে আক্তার ঢালী উল্লেখ করেন, ১৮ সেপ্টেম্বর সেনের বাজার এলাকায় মুনজিল শেখ, মোরাদ শেখ, মাসুদ মোল্যা, রোপা মোল্যাসহ কয়েকজন তাঁকে ডেকে এক পাশে নিয়ে যান। এ সময় তাঁকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয় এবং প্রাণনাশের কথাও বলা হয়।
জিডিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, তাঁর ছেলে জয় ঢালীকে শহীদের মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই হত্যা মামলায় আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাঁর ও পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং জানমালের ক্ষতির হুমকি দিচ্ছে।
নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার হাসপাতালের মর্গে ভাইয়ের লাশ নিতে এসে নিহত আক্তার ঢালীর ছোট ভাই দিনমজুর আতাউল ঢালী বলেন, “নিহত আক্তার ঢালী আমার মেজ ভাই। রূপসার সেনের বাজারে তিনি বাসের কলারম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর কোনো শত্রু ছিল না। ভাইপো জয় ঢালী হত্যা মামলার বাদী হওয়ার কারণেই তাঁকে জীবন দিতে হলো। আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছি।”
তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার সময় এলাকায় লোডশেডিং ছিল না। কিন্তু গুলি করার সময় বাড়ির ভেতর ও বাইরের বাতি বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার পরিবেশেই তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে।
চরমপন্থীদের ফিরে আসার আতঙ্ক
দুই উপজেলায় পরপর দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠনগুলোর তৎপরতা আবারও বাড়তে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, একসময় রূপসা ও দিঘলিয়া এলাকায় নিষিদ্ধ লাল পতাকা, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)সহ বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের দৌরাত্ম ছিল। এসব গোষ্ঠীর পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘাতে প্রায়ই হত্যাকাণ্ড ঘটত।
তাঁদের আশঙ্কা, সাম্প্রতিক দুই হত্যাকাণ্ড সেই পুরোনো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
তবে সাম্প্রতিক দুটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থী সংগঠনের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডগুলোর নেপথ্য কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
সৈকত মোঃ সোহাগ / এফএস