পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারে কঠোর লেনদেন বিধি আরোপ, বড় ও ভালো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বাজারে বিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানি ও আর্থিক পণ্যের ঘাটতি দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আয়োজিত এক সেমিনারে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সমস্যা ও সংস্কার নিয়ে এ কথা বলেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজারসংশ্লিষ্টরা। যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)।
সেমিনারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ছোট মূলধনের ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারে কারসাজি ঠেকাতে আলাদা শ্রেণিবিন্যাস করে কঠোর লেনদেন বিধি আরোপ করা প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের বিষয়ে আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, দেশের শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছোট মূলধনের ও দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি রয়েছে। এর সঙ্গে খুচরা বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য থাকায় কারসাজির ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক বিনিয়োগকারী অন্যদের দেখে শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। ফলে অনেক সময় সর্বোচ্চ দরের কাছাকাছি গিয়ে শেয়ার কিনে বড় ক্ষতির মুখে পড়েন।
ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে নিবন্ধিত আর্থিক বিশ্লেষকের ঘাটতিও বড় সমস্যা। পেশাদার বিশ্লেষকরা কোনো শেয়ার কেনা, বিক্রি বা ধরে রাখার বিষয়ে তথ্যভিত্তিক মতামত দিলে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে কারসাজি করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএসইসির লোগো ব্যবহার করে ভুয়া বিনিয়োগ পরামর্শ দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, অল্প সময়ে টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। গত বছর এমন কয়েকটি গ্রুপ শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এখন শুধু ব্রোকার ও বিনিয়োগকারীদের ওপর নজরদারি করলে হবে না। ডিজিটাল প্রতারণা শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করতে হবে এবং এর মাধ্যমে প্রতারণাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আস্থা সংকট কাটানো বড় চ্যালেঞ্জ
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু বাজারের সূচক বা শেয়ারের দর বাড়ানোর মাধ্যমে আস্থার সংকট কাটানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীর অর্থের নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত।
মিনহাজ মান্নান বলেন, বাজারে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ছাড়াই বিনিয়োগ করেন। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বা ব্যবসার মৌলভিত্তি না বুঝে শেয়ার কেনার কারণে তারা ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই বিনিয়োগকারীদের জ্ঞান বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের দায়িত্বও বাড়াতে হবে।
মানহীন আইপিও ঠেকাতে নতুন নীতিমালা ও যাচাই প্রক্রিয়া তৈরির কথাও জানান তিনি। ভালো কোম্পানি ছাড়া বাজারে নতুন শেয়ার না এলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ হারানোর ঝুঁকি কমবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডিএসই পরিচালক আরও বলেন, পুঁজিবাজারের ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি। কেন্দ্রীয় ডিপোজিটরি ব্যবস্থা বা সিডিএল দ্রুত চালু করা গেলে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা কমবে।
আইপিও ছাড়াই বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ
বড় দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে আইপিও ছাড়াই সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
তিনি বলেন, যেসব কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার অথবা মোট সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি, নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে তাদের সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আসা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক হবে না।
মাসুদ খান বলেন, অনেক বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। তালিকাভুক্ত হলে বিভিন্ন ধরনের নিয়মকানুন পরিপালন করতে হয়। এসব কারণে বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারের বাইরে রাখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, একটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে তার বাজারমূল্য বা মূল্যায়ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে ব্যাংক থেকেও তালিকাভুক্ত কোম্পানি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পায়। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে রাইট শেয়ার বা পাবলিক অফারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের সুযোগও তৈরি হয়।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে কমিশন সরাসরি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারের বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত প্রায় ৬ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এ হার অনেক কম। তাই বাজার মূলধন বাড়াতে বড় ও ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা জরুরি।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের আকার বাড়াতে আইপিও ও বন্ডের সংখ্যা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর হবে বাজার নজরদারি
বাজারের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা জানান মাসুদ খান। তিনি বলেন, কয়েকশ কোম্পানি থেকে ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা আরও বাড়বে। তখন শুধু জনবল দিয়ে কার্যকর নজরদারি সম্ভব হবে না।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে একটি ট্র্যাকিং সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য ও তহবিলের গতিবিধির ওপর নজরদারি করা যাবে।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাক অফিস ব্যবস্থায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সফটওয়্যারের সমন্বয়ের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তদন্তের প্রক্রিয়া দ্রুত করার কথা বলেন তিনি।
মাসুদ খান বলেন, কোনো শেয়ারের দরে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে তদন্তের জন্য বিষয়টি কমিশন সভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রয়োজন হবে না। সংশ্লিষ্ট ইউনিট সরাসরি পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাজারে প্রায় ৯৩ শতাংশ বিনিয়োগকারী খুচরা। বিপরীতে মালয়েশিয়ায় এ হার প্রায় ১৯ শতাংশ এবং ভারতে প্রায় ৩৩ শতাংশ। তাই বড় প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘমেয়াদি তহবিলকে বাজারে আনা প্রয়োজন।
এ জন্য করপোরেট বন্ড বাজার বড় করা, বিমা কোম্পানির জীবন তহবিলসহ দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের শেয়ার ও করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি, শেয়ার ঋণের ব্যবস্থা করে ফিউচার ও ডেরিভেটিভস বাজার চালু এবং রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রেইট) চালুর কাঠামো তৈরির উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
স্বল্পমেয়াদি লাভের পেছনে না ছোটার পরামর্শ
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান বিনিয়োগকারীদের স্বল্পমেয়াদি লাভের চিন্তা থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিনিয়োগের পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন স্বাভাবিক। তাই বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে হবে। সব অর্থ একটি জায়গায় বিনিয়োগ না করে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করলে বাজারের পতনের সময় ঝুঁকি সামাল দেওয়া সহজ হবে।
বিনিয়োগের পাশাপাশি নিজের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। বাজার খারাপ থাকার সময় দৈনন্দিন খরচ চালাতে যেন কম দামে শেয়ার বিক্রি করতে না হয়, সে জন্য বিনিয়োগকারীদের হাতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন সিএসই চেয়ারম্যান।
তিনি আরও বলেন, গুজব বা অপপ্রচারের ভিত্তিতে বিনিয়োগ না করে কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেল, আর্থিক অবস্থা ও ব্র্যান্ড ইমেজসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে হবে। অতিরিক্ত লাভের লোভে অননুমোদিত উৎসের পরামর্শ অনুসরণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
ভালো পণ্য ছাড়া বিনিয়োগ শিক্ষা যথেষ্ট নয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন আল-আমিন বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগযোগ্য ভালো কোম্পানি ও আর্থিক পণ্য না থাকলে শুধু বিনিয়োগ শিক্ষা দিয়ে বাজারে বিনিয়োগকারী বাড়ানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, দেশে প্রায় ১৬ লাখ ৭৫ হাজার বিও হিসাব থাকলেও সক্রিয় বিও হিসাব মাত্র প্রায় ২ লাখ। বাজারে বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানি ও পণ্যের ঘাটতি থাকলে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
আল-আমিন বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৩২টি কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ অবস্থায় ছিল। এর মধ্যে ২০০২ সাল থেকে বন্ধ থাকা একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছে। এমন ঘটনা বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
তিনি বলেন, অনেক প্র্যাকটিসিং ব্রোকারও ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দিকে চলে যাচ্ছেন। সেখানে তুলনামূলক ভালো রিটার্ন পাওয়া গেলে এবং শেয়ারবাজারে পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য পণ্য না থাকলে তাদের নিরাপদ বিকল্প বেছে নেওয়াকে দোষ দেওয়া যায় না।
পেনশন ফান্ডসহ দীর্ঘমেয়াদি তহবিলকে পুঁজিবাজারে আনতে হলে আগে বাজারকে প্রস্তুত করার পরামর্শ দেন তিনি। এসব তহবিলের বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত ও আকর্ষণীয় আর্থিক পণ্য থাকতে হবে।
আর্থিক প্রতিবেদনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আল-আমিন বলেন, আর্থিক বিবরণীর ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী আনা সম্ভব হবে না। এ জন্য অডিট ব্যবস্থার মান বাড়ানো প্রয়োজন।
পুঁজিবাজারে ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ প্রবণতা বন্ধের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কোনো শেয়ারের দাম মৌলভিত্তির বাইরে অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কারা শেয়ার কিনছে তা শনাক্ত করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আল-আমিন বলেন, পুঁজিবাজারে অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমঝোতার পথে গেলে বাজার টিকবে না। পুঁজিবাজারকে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
টিআই