শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া ও রাস্তায় আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে দেশজুড়ে সব হাইস্কুলের ক্লাস স্থগিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এর মধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, দুপুরের খাবারের বিরতি বাড়ানো এবং স্কুলে দৈনিক ক্লাসের সময়সূচিতে পরিবর্তনের মতো দাবিও রয়েছে। এ সময় কয়েকটি হাইস্কুল অবরোধ করে রাখা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। তবে আয়োজকদের দাবি, শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি। হাইস্কুল শিক্ষার্থী ইউনিয়ন জানিয়েছে, প্রায় ২ হাজার হাইস্কুলে অবরোধ করা হয়েছে অথবা ক্লাস বন্ধ ছিল।
রাজধানী প্যারিসের একটি মিছিল থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক নাতাশা বাটলার জানান, বিক্ষোভে যোগ দেয়া বিভিন্ন সংগঠনের সংখ্যা বাড়ছে। বাটলার বলেন, ‘বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। কৃষক ইউনিয়ন, জ্বালানি খাতের কর্মী এবং শিক্ষক ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলোও শিক্ষার্থীদের সমর্থনে রাস্তায় নামার কথা জানিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিভাবক ও শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, তারা শুধু সন্তানদের সমর্থন করতেই এখানে আসেননি, তাদের নিরাপত্তার জন্যও এসেছেন। কারণ বিক্ষোভে উসকানিদাতা কেউ ঢুকে পড়তে পারে এবং পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন।’
মার্সেই, নঁত ও লিওঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামেন। এসব প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘তারা আসলে আমাদের নিয়ে ভাবে না’ এবং ‘বাঁচো অথবা পড়াশোনা করো’। স্ট্রাসবুর্গ, লিওঁ ও রেনে শহরে বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন জ্বালানোর পাশাপাশি পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন।
স্ট্রাসবুর্গের সাম্প্রতিক হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেয়া হুগো ভেটজেল নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘জবাব যখন সহিংসতা দিয়ে দেয়া হয়, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্র আর কাজ করছে না। অভিজাত শ্রেণি আর আমাদের মধ্যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে।’
আল জাজিরা বলছে, দুই সপ্তাহ আগে প্যারিসের সবচেয়ে দরিদ্র শহরতলিগুলোতে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার বলছে, এই আন্দোলন এখন শহুরে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এ কারণে কয়েকটি সমাবেশে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এমন অবস্থায় ক্লাস স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেন, ‘একটি হাইস্কুল পুড়িয়ে দিলে ওই স্কুলের ভবনের অবস্থা ভালো হয় না’। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের স্কুলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো সমাধানে প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ‘অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের’ মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ করে দিতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে অক্টোবরের শেষ নাগাদ পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পুরোনো স্কুল ভবন সংস্কারের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করবে বলে জানান লেকর্নু। তবে সরকার কত দ্রুত এসব দাবিতে সাড়া দিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আল জাজিরার বাটলার বলেন, ‘ফ্রান্স ঋণে জর্জরিত। দেশটি প্রকৃত অর্থেই বাজেট সংকটে রয়েছে। তাহলে সরকারি সেবায় অর্থ বরাদ্দ দিতে সেই টাকা আসবে কোথা থেকে?’
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ৬ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে। দেশটির বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
লেকর্নুর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত ২১৫ জন কিশোর এবং ৭১৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
এর আগে গত সোমবার উত্তরাঞ্চলীয় শহর লঁসে হাইস্কুল শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত উড়ে যায়। সরকার জানিয়েছে, ওই সংঘর্ষে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়েছিলেন।
ফরাসি সংবাদপত্র লা ভোয়া দ্য নোর জানিয়েছে, বিক্ষোভের সময় পুলিশের একটি গ্রেনেড তুলে নেয়ার পর বিস্ফোরণে ওই কিশোরের একটি হাত ও হাতের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এদিকে ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনো প্রমাণ না দিয়েই তিনি এর জন্য লাগামহীন অভিবাসন ও মুসলিমদের দায়ী করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘ফ্রান্সে যা ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণহীন গণঅভিবাসন ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা স্কুল নিয়ে নয়, বরং ইসলাম একসময় ফ্রান্সকে দখল করে নিতে চাইছে—এটাই আসল বিষয়।’
এর আগে গত আগস্টে আসন্ন মধ্যবর্তী মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থীদের ‘জিহাদি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত সপ্তাহে মিশিগানের প্রাইমারি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর মুসলিম ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদের প্রসঙ্গেই তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ডানপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও নির্বাচিত কর্মকর্তাদের মধ্যে এ ধরনের বক্তব্য ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যকে আরও উসকে দিচ্ছে।
এসএ