গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৮০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তা। এছাড়া ১৭০-এর বেশি শিক্ষককে আটক করা হয়েছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে শিক্ষা খাত নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে শুধু স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় নয়, প্রাণ হারিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ।
শিক্ষকদের ওপর হামলার এই চিত্র গাজার শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ বিপর্যয়ের একটি অংশ মাত্র। যুদ্ধের কারণে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পরিণত হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। ফলে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে বহু এলাকায়।
ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোর ধ্বংস এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও তারা শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু একের পর এক প্রাণহানি ও আটক শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সেই প্রচেষ্টাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও শিক্ষকদের নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট, চলাচলে বিধিনিষেধ ও হয়রানির কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে হেবরনের দক্ষিণের মাসাফের ইয়াত্তা, মধ্য পশ্চিম তীরের আল-মুঘাইয়ির, জর্ডান উপত্যকা এবং ‘এরিয়া সি’ হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষা খাতের সংকট আরও গভীর হয়েছে আর্থিক সমস্যায়। ফিলিস্তিনি মন্ত্রণালয় বলছে, ফিলিস্তিনের রাজস্ব অর্থ আটকে রাখার কারণে সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষকসহ শিক্ষা খাতের কর্মীদের ওপর। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষা। কিন্তু যুদ্ধ ও দখলদারিত্বের কারণে সেই শিক্ষা ব্যবস্থাই এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। শিক্ষক নিহত হচ্ছেন, আটক হচ্ছেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ফিলিস্তিনি মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি শিক্ষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আটক শিক্ষকদের মুক্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কার্যক্রমের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি শিক্ষকদের আর্থিক পাওনা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা দাবি করেছে।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মের ওপর নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়বে। তাই ফিলিস্তিনি শিশুদের শিক্ষা ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন মানবিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়।
এফএস