ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
দুই বছর আগের দলবদ্ধ ধর্ষণ ঘিরে এত দিন পর কেন উত্তপ্ত নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪২ এএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর এবার অপরাধীদের কঠোর শাস্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র সমাবেশে এক শিক্ষার্থী অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমাদের ক্যাম্পাসে যা ঘটেছে, তা নিয়ে আমরা ভীষণভাবে লজ্জিত।’ মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস ঘটনা এবং এর ধীরগতির তদন্ত পুরো শিক্ষাঙ্গনের ওপর এক ‘কালো মেঘের ছায়া’ ফেলেছে বলে মনে করছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ছাত্রসংগঠনগুলোর ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ক্যাম্পাসের ভেতরের বিষাক্ত সংস্কৃতি এবং পুরো ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেভাবে সামলেছে, তা নিয়ে চারদিকে সমালোচনার ঝড় বইছে।

বৃহস্পতিবারের ওই ছাত্র সমাবেশে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ওই ধর্ষণের ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা ও কথিত বিচারহীনতাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এই আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক গাফিলতির তীব্র সমালোচনা করেন।

সমাবেশে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী সোফিয়া রাইলি সিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের জানার অধিকার রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠান নিজের সুখ্যাতি ও সুনাম বাঁচানোর চেয়ে আমাদের নিরাপত্তাকে বেশি মূল্য দেয় কি না।’ তিনি আরও বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তিনি এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে, এক সপ্তাহ ধরে কোনো ক্লাসেও উপস্থিত থাকতে পারেননি।

বছরের এই সময়ে নিউইয়র্কে অবস্থিত কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসটি সাধারণত তুষার ও রঙিন শরৎকালীন পাতায় সেজে এক অতুলনীয় রূপ ধারণ করে। তবে এই শান্ত শিক্ষাঙ্গনটি এখন পুরোপুরি অশান্ত ও উত্তপ্ত।

২০২৪ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রসংগঠনের কার্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে মাদক সেবন করিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। দুই বছর পর সেই অভিযোগ নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে।

বিবিসির সঙ্গে কথা বলা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অনুষদ সদস্য নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ২০২৪ সালের ওই ঘটনা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবার নতুন করে সামনে আসায় ক্যাম্পাস প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার সেই ভুক্তভোগী ছাত্রী আইনি সুরক্ষার স্বার্থে জেন ডো ছদ্মনামে পরিচিত। তিনি গত ১৬ সেপ্টেম্বর এ ঘটনায় একটি দেওয়ানি মামলা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দুই বছর আগে একটি ছাত্রসংগঠনের কার্যালয়ে (ফ্র্যাটার্নিটি হাউস) নিয়ে তাঁকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছিল।

জেন ডোর অভিযোগ, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে এবং ধর্ষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

এই তীব্র সমালোচনার মুখে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশ্য নিজেদের নেওয়া পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা ধর্ষণের এই গুরুতর অভিযোগের একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করতেও রাজি হয়েছে। এ পর্যন্ত বিষয়টি যেভাবে সামলানো হয়েছে, তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে, ঘটনার খবর পাওয়ার পর কয়েক মাস ধরে তারা নিজস্ব ‘টাইটেল নাইন’ আইনের অধীন একটি ‘বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ তদন্ত’ চালিয়েছিল এবং এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফেডারেল নাগরিক অধিকার আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।

শুনানির পর প্যানেল দোষীদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী ও সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্তও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সেই সুনির্দিষ্ট শাস্তির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে কর্নেল কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘আমরা বুঝি, এই আইনি বাধ্যবাধকতা শিক্ষার্থীদের জন্য হতাশাজনক হতে পারে।’

কিন্তু প্রশাসনের এই জবাবে ক্যাম্পাসের ক্ষোভ কমেনি; বরং আরও তীব্র হয়েছে। এক শিক্ষার্থী স্মৃতিচারণা করে বলেন, ২০২৪ সালে ঘটনার পর ভুক্তভোগী জেন ডোকে নিয়ে নানা কুরুচিপূর্ণ গুজব ছড়াতে থাকায় ক্যাম্পাসের পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল।

ঘটনার দুই বছর পর ওই শিক্ষার্থী বিবিসির কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি ও তাঁর বন্ধুরা এখন চরম হতাশা ও উদ্বেগের মধ্যে আছেন। ক্যাম্পাসের এই থমথমে পরিবেশকে একটি ‘কালো মেঘের’ সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামলাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক।

একই সঙ্গে অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ‘চি ফি’ ফ্র্যাটার্নিটির গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত থাকা একাধিক পুরুষ সদস্য কেন এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

২০২৪ সালেই এই বিতর্কিত ছাত্রসংগঠনের শাখাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং এখনো ক্যাম্পাসে সেটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার ছাত্র সংসদের সভায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাঁদের তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এলিয়ানা ডলভেন-মিলার বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানে এত অর্থ ব্যয় করে পড়াটা এখন আমার কাছে ঘৃণ্য ও লজ্জাজনক মনে হচ্ছে।’ সভায় সবাই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন।

ছাত্র সংসদের সভাপতি ঈশান চৌধুরী সভার শুরুতে বলেন, পুরো ক্যাম্পাস যৌন সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগীদের পাশে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এই অপরাধ বরদাশত করব না। আমাদের ক্যাম্পাসে যা ঘটেছে, তার জন্য আমরা লজ্জিত।’

একই সঙ্গে ছাত্র সংসদ একটি প্রস্তাব পাস করে এই ঘটনার তদন্ত ও পুলিশকে জানানোর খুঁটিনাটি সব তথ্য লিখিত আকারে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত ‘হতাশাজনক’। শিক্ষকেরা পেশাদার থেরাপিস্ট না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এই সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কীভাবে ক্লাসরুমে আলোচনা করা উচিত, তা বুঝে ওঠা তাঁদের জন্য কঠিন হচ্ছে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৫ অক্টোবর কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জাস্টিস ফর সারভাইভারস’ (নিপীড়িতদের জন্য ন্যায়বিচার) শিরোনামে বড় ধরনের এক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে, যার প্রচারপত্র ও পোস্টারে এখন পুরো ক্যাম্পাস ছেয়ে গেছে।

এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের স্থায়ী বহিষ্কার ও তাঁদের শিক্ষাগত ডিগ্রি বাতিল, যৌন নিপীড়নের শাস্তিবিষয়ক নীতিমালা সংশোধন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত এবং ক্যাম্পাস পুলিশের জন্য বাধ্যতামূলক অপরাধ প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণের দাবি তুলেছেন।

শুধু বর্তমান ছাত্ররাই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি সাবেক শিক্ষার্থীও (অ্যালামনাই) এক খোলাচিঠিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ‘ছাত্র’ পত্রিকায় প্রকাশিত ওই চিঠিতে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় কি নিজেদের ভাবমূর্তি বাঁচাতে সংস্কার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নাকি এ ঘটনাকে ক্যাম্পাসে যৌন সহিংসতা বন্ধের সুযোগ হিসেবে দেখবে? এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সমাবেশের কিছুক্ষণ পর নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল এক বড় ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, তিনি এই ধর্ষণ মামলায় অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমসকে বিশেষ কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

ক্যাথি হোকুল স্পষ্ট করে বলেন, আগে এই তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়া টম্পকিন্স কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ম্যাথিউ ভ্যান হিউটেনের ওপর তিনি আস্থা হারিয়েছেন। তাই এখন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কাছ থেকে মামলাটির দায়িত্ব পুরোপুরি চলে যাবে লেটিসিয়া জেমসের হাতে।

ভ্যান হিউটেনের কার্যালয় শুরুতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ফৌজদারি মামলা করার জন্য পর্যাপ্ত আইনি তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে গত সপ্তাহে দায়ের হওয়া নতুন দেওয়ানি মামলার প্রেক্ষাপটে তারা আবারও এই ঘটনার ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। প্রসিকিউটরের এই পুনঃ তদন্তের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এসএ
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement