প্রাণী প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের জীবন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে প্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল। বন উজাড়, নির্বিচারে শিকার, অবৈধ পাচার, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রাণী আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। প্রাণীর প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও সহমর্মিতা বাড়াতে প্রতিবছর ৪ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব প্রাণী দিবস।
প্রাণীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি উপলক্ষে প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা, সচেতনতামূলক প্রচার, অসুস্থ ও আহত প্রাণীর চিকিৎসা এবং প্রাণী সুরক্ষায় নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
প্রাণী ও মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। মানুষের খাদ্য, কৃষি, পরিবহন ও পরিবেশের সঙ্গে বিভিন্ন প্রাণী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। আবার প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ঠিক রাখতেও প্রাণীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো একটি প্রজাতি কমে গেলে বা বিলুপ্ত হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো পরিবেশব্যবস্থায়।
বিশেষ করে বন্যপ্রাণীদের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বনভূমি ধ্বংসের কারণে অনেক প্রাণী তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। খাদ্য ও পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। মানুষের বসতি ও সড়ক সম্প্রসারণের কারণে প্রাণীদের চলাচলের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক প্রাণী খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে মানুষের সঙ্গে সংঘাতের মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে অর্থের লোভে বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারও চলছে। বিভিন্ন বিরল প্রাণী ও পাখিকে ধরে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে শুধু একটি প্রাণীর জীবনই বিপন্ন হচ্ছে না, প্রকৃতির ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রাণীদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো নানা পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে প্রাণীদের জীবনযাত্রায়। অনেক প্রাণী আগের মতো খাবার ও নিরাপদ আশ্রয় পাচ্ছে না। ফলে কোনো কোনো প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও প্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব অনেক। সুন্দরবনসহ দেশের বনাঞ্চল, নদী, হাওর, বিল ও জলাভূমিতে রয়েছে অসংখ্য প্রাণী ও পাখির আবাস। রয়েল বেঙ্গল বাঘ, হরিণ, বানর, কুমির, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু বন ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, নদীদূষণ, শিকার ও অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের কারণে দেশের অনেক প্রাণীও হুমকির মুখে রয়েছে। শহরাঞ্চলে কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীও মানুষের নিষ্ঠুরতা ও অবহেলার শিকার হয়।
প্রাণী সুরক্ষায় শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। কোনো প্রাণীকে অকারণে হত্যা বা নির্যাতন না করা, আহত প্রাণী দেখলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বন্যপ্রাণী ধরে পোষা থেকে বিরত থাকা এবং প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস না করা। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ শেখানো জরুরি। কারণ প্রকৃতিকে ভালোবাসার শিক্ষা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু হয়।
বিশ্ব প্রাণী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়। এই গ্রহে মানুষের পাশাপাশি অসংখ্য প্রাণীরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীদের নিরাপদ অস্তিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। তাই প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করে তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করাই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।
এফএস