রাকসু নির্বাচনে শিবিরের ‘ডামি প্যানেল’ হিসেবে আলোচিত ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন সালাউদ্দিন আম্মার। ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীব পরে শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এবার এক বছর আগেই রাবি শিবিরের সাথীপদ হারিয়েছেন আম্মার।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শাখা শিবিরের প্যাডে বহিষ্কার-সংক্রান্ত তিনটি চিঠি ছড়িয়ে পড়লে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
চিঠিতে নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, মেয়েদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ তছরুপ এবং সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ‘ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার’ কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়।
বুধবার রাতেই এক ফেসবুক পোস্টে আম্মার বলেন, তিনি শিবিরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাঁর দাবি, অভিযোগের পক্ষে শিবির কোনো প্রমাণ দেয়নি। অভিযোগ প্রমাণ করতে তিনি শিবিরকে চ্যালেঞ্জও জানান।
সাথীপদ বাতিলের বিষয়টি সামনে আসার পর গত দুই বছরে আম্মারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আবারও আলোচনায় এসেছে। অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবি, সংগঠনের পরিচয়ে শিবির এত দিন যেসব কাজ করতে পারেনি, তা আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে। বহিষ্কারের ঘটনাকে শিবিরের কৌশল হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, আম্মারকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিজেদের দায় এড়াতে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতেই শিবির এমন কৌশল নিয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী শিবিরের রাজনীতিকে ‘নোংরামি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, সুস্থ ধারার রাজনীতি শিবির কখনোই পছন্দ করে না। তাই রাজনীতির নামে তারা বারবার এমন কাজ করে।
শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “আম্মারকে বহিষ্কারের বিষয়টি লোক দেখানো। আমরা বারবারই বলে এসেছি, আম্মার শিবিরেরই অংশ। অফিসিয়ালি শিবির যে কাজগুলো করতে পারে না, আম্মার সেগুলোই করেন। তাঁকে বহিষ্কারের ঘটনাটিও শিবিরের আরেকটি অপকৌশল।”
রাকসু নির্বাচনের আগে থেকেই নানা ঘটনায় আলোচনায় ছিলেন আম্মার। জুলাই আন্দোলনে স্লোগান দিয়ে সামনে আসা এই নেতার বিরুদ্ধে জুলাইয়ের পর একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগ সন্দেহে শিক্ষার্থীদের ধরে পেটানো থেকে শুরু করে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি ও চাঁদাবাজির মতো অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাবির এক শিক্ষার্থীর ওপর আরএনবির হামলার অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টেশনে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। তবে তাঁর দাবি, ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্যই তিনি সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন।
গত ২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে হামলার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় বেলচা হাতে শিক্ষার্থীকে হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এখনো প্রতিবেদন জমা হয়নি।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যাকাণ্ডেও আম্মারের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে।
আম্মারের দাবি, ওই সময় তিনি অন্য একটি ধর্ষণ মামলার বিষয়ে বোয়ালিয়া থানায় ছিলেন। ছাত্রলীগ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে তাঁকে এ মামলায় জড়িয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক জালাল উদ্দিন বলেন, “তদন্ত চলমান থাকায় বিষয়টি এখনো অত্যন্ত গোপনীয়। শুধু বলতে পারি, আমাদের তদন্ত চলছে।”
এর আগে ‘জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের জন্য ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনায়ও আম্মারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে ‘প্রস্তাবপত্র’ বলে দাবি করেন।
পোষ্য কোটা আন্দোলন ঘিরে তৎকালীন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দিনের বাসভবন ঘেরাও, তাঁর গাড়িতে টাকা ছুড়ে মারা ও শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। একই সময়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখার আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ছয় অনুষদের আওয়ামী লীগপন্থী ডিনদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করে তাঁদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন রাবি জিয়া পরিষদের সভাপতি ড. নেছার উদ্দিনের টাঙানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে আম্মারের বিরুদ্ধে।
এইচসি/আরএন