আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পরিচিতি পাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে গত দুই বছরে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে সংঘর্ষ, শিক্ষক-প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ, মব তৈরি করে ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ থেকে শুরু করে চাঁদা দাবি ও একটি হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ—বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় এসেছে তাঁর নাম। সর্বশেষ রাবি শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনায়ও সামনে এসেছে তাঁর নেতৃত্বের বিষয়টি।
স্টেশনকেন্দ্রিক বিক্ষোভ থেকে ভাঙচুর
গত রোববার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাবি শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদে রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে এক ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন আম্মার। পরে রেলওয়ের চার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ।
এরপরও ‘মার্চ টু রাজশাহী স্টেশন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ওই কর্মসূচিতে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন বলে জানা যায়। পরে স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আম্মারের উপস্থিতি ও নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
লাইব্রেরির ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক
এর আগে গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগে আলোচনায় আসেন আম্মার। অভিযোগ রয়েছে, এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে তাঁর দুই সহপাঠীর ওপর হামলার নেতৃত্ব দেন তিনি।
ঘটনার সময় আম্মারকে বেলচা হাতে ওই শিক্ষার্থীকে হুমকি দিতে দেখা যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মুখে ছিল—‘তোরে মাইরা ফেলমু, পুইতা ফেলমু। পুইতা ফেলমু একেবারে।’
পরে প্রক্টর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করলে তাঁদের আবারও মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় পরে আম্মারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা হয়।
মব তৈরি করে ডিনদের পদত্যাগের অভিযোগ
জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন আম্মার। গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ‘পোষ্য কোটা’ সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি, উপ-উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও এবং গাড়িতে টাকা ছোড়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
একই দাবিকে কেন্দ্র করে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ দেড় শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীকে অবরুদ্ধ রাখার ঘটনাতেও তাঁর নেতৃত্বের অভিযোগ রয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় একই বছরের ২১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি অনুষদের আওয়ামী লীগপন্থী ডিনদের বিরুদ্ধে মব তৈরি করে তাঁদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে আম্মারের বিরুদ্ধে। পদত্যাগপত্র হাতে নিয়ে তাঁদের কার্যালয়ে তালা দেওয়ার ঘটনাতেও তাঁকে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাসুদ হত্যাকাণ্ডে ও উঠেছিল নাম
এর আগে রাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরেও আলোচনায় আসেন সালাহউদ্দিন আম্মার।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিনোদপুর বাজারে দুধ ও ওষুধ কিনতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন মাসুদ। পরে তাঁকে বোয়ালিয়া থানার সামনে মুমূর্ষু অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে আম্মারের উপস্থিতি ছিল—এমন দৃশ্য একটি ভিডিওতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে মাসুদকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এ ঘটনায় আম্মারের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও তিনি কোনো অপরাধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—পিবিআইয়ের তদন্ত চলমান বলে জানা গেছে।
কনসার্টের অর্থ সংগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন
গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব’ নামে কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েও বিতর্কে জড়ান আম্মার। ওই আয়োজনের জন্য ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও তোলা হয়। তবে অভিযোগটির বিষয়ে আম্মারের বক্তব্য হলো, তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে বিভিন্ন অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে।
‘প্রমাণ থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নিন’
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘ছাত্রলীগ এবং তাদের মাদার সংগঠন আমার বিরুদ্ধে সব সময় তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এগুলো ছড়িয়েছে। আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ থাকলে তারা যেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়।’
‘সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা’
গণতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, আম্মার প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের উসকানি দিয়ে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছেন এবং সেই সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্ব ও স্বার্থ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এসব ঘটনায় বারবার শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, ‘আম্মারের প্রতিটি আন্দোলনের সূচনা হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বিষয় নিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পাকিস্তান, আল-কায়েদা বা শিবিরের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে চলে যায়।’
‘মব কালচার শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ‘মব কালচার’ কোনোভাবেই থাকা উচিত নয়। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, মব কালচার শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নষ্ট করে।
এসএ