‘ছেলে-মেয়েরা কোথায়?’
প্রশ্নটি খুব ছোট। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আব্দুল হান্নানের চোখ ভিজে যায়।
একসময় তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন, সংসারের হাল ধরেছেন। নিজের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব না কষে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছেন। কর্মব্যস্ত সেই দিনগুলো কখন যে ফুরিয়ে গেছে, আর বয়স কখন শরীরের ওপর ভার হয়ে বসেছে-সেটি যেন টেরই পাননি।
আজ স্ত্রী নেই। ছেলে-মেয়ে আছে-এটুকু জানেন। কিন্তু তারা কে কোথায় আছেন, কেমন আছেন, সেই খবর তার কাছে নেই। তার খবরও কেউ নেয় না।
কথার একপর্যায়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি আব্দুল হান্নান।
অশ্রুসিক্ত চোখে শুধু বললেন,
“যত তাড়াতাড়ি দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারি, ততই মঙ্গল।”
এই একটি বাক্যের ভেতরেই যেন আটকে আছে দীর্ঘ একটি জীবনের ক্লান্তি।
যে মানুষটি সারাজীবন অন্যদের জন্য ছুটেছেন
মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন দৌড়ানোর প্রয়োজন থাকে না। তখন প্রয়োজন হয় পাশে হাঁটার একজন মানুষ।
আব্দুল হান্নানের জীবনেও সেই সময় এসেছে।
যে বয়সে তিনি সংসারের জন্য ছুটেছেন, সন্তানদের জন্য চিন্তা করেছেন, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন-আজ সেই বয়সে এসে তার নিজের পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ নেই।
গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকার মনিপুরে গিভেন্সী গ্রুপের ১০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র এখন তার ঠিকানা।
তবে শুধু আব্দুল হান্নান নন। এই ঠিকানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও ১৫৯টি জীবনের গল্প।
এখানে থাকছেন মোট ১৬০ জন প্রবীণ-৮৫ জন পুরুষ ও ৭৫ জন নারী।
কারও জীবনে সংসার ছিল, কিন্তু সংসার নেই।
কারও সন্তান আছে, কিন্তু কাছে নেই।
কারও জীবনসঙ্গী চলে গেছেন বহু আগে।
আবার কারও কাছে আপনজন বলতে এখন শুধু পুরোনো স্মৃতি।
এক ছাদের নিচে তাই ১৬০টি মানুষ থাকলেও, প্রত্যেকের নিঃসঙ্গতার গল্প আলাদা।
নিরাপদ ঘর মিলেছে, আপন মানুষটি মেলেনি
ময়মনসিংহ থেকে এখানে এসেছেন আব্দুল গফুর।
জীবনের একসময় তারও ছিল ব্যস্ত সংসার, আপন মানুষ আর নানা দায়িত্ব। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত জগত ধীরে ধীরে ছোট হয়েছে। একসময় এসে থেমেছে এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
এখানে থাকার জায়গা আছে। নিয়মিত খাবার আছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও আছে। যারা দেখাশোনা করেন, তাদের কাছ থেকেও ভালো ব্যবহার পান তিনি।
তবু সবকিছু পাওয়ার পরও কোথাও একটা শূন্যতা থেকে যায়।
সেটি কোনো ওষুধে পূরণ হয় না।
কারণ মানুষ যত বয়সীই হোক, নিজের মানুষকে ভুলে থাকা তার পক্ষে সহজ নয়।
আব্দুল গফুরের কথায় তাই স্বস্তির পাশাপাশি লুকিয়ে থাকে আক্ষেপ।
নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া গেছে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া আপনজনের জায়গাটা খালি রয়ে গেছে।
৭৬ বছর বয়সেও অপেক্ষা থাকে কথার
৭৬ বছর বয়সী আলতাফ হোসেনও জানেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে প্রয়োজনগুলো বদলে যায়।
একসময় বাবা-মা তাকে আগলে রেখেছেন। পরে নিজের সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন। সংসারের প্রয়োজনে ছুটেছেন, নিজের প্রয়োজনকে বারবার পেছনে রেখেছেন।
আজ শরীর আর আগের মতো চলে না।
কাজের শক্তি কমেছে, কমেছে জীবনের ব্যস্ততাও।
কিন্তু কথা বলার ইচ্ছেটা কমেনি।
আলতাফ হোসেনের কাছে এই বয়সে টাকা-পয়সার চেয়ে মানুষের ভালোবাসা ও একটু কথা বলার সঙ্গই বেশি প্রয়োজন।
কথাটি শুনতে খুব সাধারণ।
কিন্তু এই কেন্দ্রের অনেক প্রবীণের জীবনে এটাই যেন সবচেয়ে বড় অভাব।
একই ছাদের নিচে ১৬০টি অতীত
মনিপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রকে বাইরে থেকে দেখলে হয়তো একটি আবাসনকেন্দ্রই মনে হবে।
কিন্তু ভেতরে ঢুকলে দৃশ্যটা অন্যরকম।
কেউ বসে আছেন চুপচাপ।
কেউ পুরোনো দিনের কথা বলছেন।
কেউ নামাজ-প্রার্থনায় সময় কাটাচ্ছেন।
কেউ অন্যের গল্প শুনছেন।
কারও চোখে সন্তানের মুখ।
কারও মনে পুরোনো ঘর।
কারও স্মৃতিতে কর্মব্যস্ত দিন।
এখানে থাকা মানুষগুলোর বয়স বেড়েছে। কিন্তু তাদের স্মৃতি বৃদ্ধ হয়নি।
তাই অতীতের মানুষগুলোও মাঝেমধ্যে বর্তমান হয়ে ফিরে আসে।
একটি ফোনকল, একটি পরিচিত কণ্ঠ কিংবা হঠাৎ কোনো স্বজনের দেখা-এসব ছোট ঘটনা তাদের পুরো দিনটাকেই বদলে দিতে পারে।
তখন মুখের ভাষা বদলে যায়। চোখে আসে অন্যরকম আলো।
বোঝা যায়, একজন মানুষকে শুধু নিরাপদে রাখলেই তার সব প্রয়োজন পূরণ হয় না।
‘সন্তানদের ভালোবাসা আমরা দিতে পারি না’
কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. বাদল মিয়া জানান, বর্তমানে এখানে ১৬০ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে ৮৫ জন পুরুষ এবং ৭৫ জন নারী। নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রবীণদের খাবার, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনায় তাদের দেখভাল করা হয়।
তবে সব আয়োজনের পরও একটি জায়গায় এসে প্রতিষ্ঠানটির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাদল মিয়ার কথায়, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনির ভালোবাসা কোনো প্রতিষ্ঠান দিতে পারে না।
এই সত্যটিই হয়তো সবচেয়ে কঠিন।
কারণ একটি প্রতিষ্ঠান দিতে পারে বিছানা।
দিতে পারে খাবার।
দিতে পারে চিকিৎসা।
দিতে পারে নিরাপত্তা।
কিন্তু ‘বাবা কেমন আছ?’-
এই প্রশ্নটি দিতে পারে কেবল আপনজন।
বৃদ্ধাশ্রমের গল্পে আমরা কোথায়?
নচিকেতার গানের সেই বহুল পরিচিত বৃদ্ধাশ্রমের গল্পের মতোই প্রশ্নটি ফিরে আসে-
শেষ বয়সে একজন বাবা-মায়ের ঠিকানা কেন আপন ঘরের বাইরে হবে?
তবে মনিপুরের বাস্তবতা কোনো গানের পুনরাবৃত্তি নয়। এখানে প্রত্যেক মানুষের গল্প আলাদা। কারও সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক কী কারণে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কারও স্বজন কেন পাশে নেই-তার উত্তরও এক নয়।
কিন্তু সবার গল্পের ভেতর একটি জায়গায় মিল আছে।
বয়স বাড়লে মানুষ শুধু চিকিৎসা চায় না।
শুধু খাবার চায় না।
শুধু মাথার ওপর ছাদও চায় না।
সে চায় কেউ তার কথা শুনুক।
কেউ পুরোনো দিনের গল্পে বিরক্ত না হয়ে পাশে বসুক।
কেউ হয়তো শুধু একবার জিজ্ঞেস করুক-
‘কেমন আছেন?’
১৬০ জন প্রবীণের কাছে ফিরে আসে একই প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে প্রবীণদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার কথা বলা হয়। আলোচনা হয় তাদের অবদান নিয়ে।
কিন্তু মনিপুরের এই ১৬০ জন মানুষের দিকে তাকালে প্রশ্নটা আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।
আমাদের ঘরে থাকা বাবা-মায়ের জন্য আমরা কতটা সময় রাখি?
যে বাবা নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে সন্তানের স্কুলের ফি দিয়েছেন, যে মা নিজের জন্য নতুন কাপড় না কিনে সন্তানের জন্য কিনেছেন-
বয়স হলে তাদের প্রয়োজন কি শুধু ওষুধ আর খাবারে শেষ হয়ে যায়?
সম্ভবত নয়।
মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়টি খুব দীর্ঘ নাও হতে পারে। কিন্তু সেই সময়টুকু কেমন কাটছে, সেটিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আব্দুল হান্নানের চোখের জল, আব্দুল গফুরের শূন্যতা আর আলতাফ হোসেনের ‘একটু কথা বলার মানুষ’-এর আকাঙ্ক্ষা সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়।
মনিপুরের পুনর্বাসন কেন্দ্রে ১৬০ জন প্রবীণ নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন।
কিন্তু তাদের অনেকের মন এখনো খুঁজে ফেরে সেই পুরোনো দরজাটি-যেখানে কেউ অপেক্ষা করে থাকবে।
হয়তো সেখানে কোনো দামি জিনিস থাকবে না।
থাকবে না বড় আয়োজনও।
শুধু একজন আপন মানুষ দরজা খুলে বলবে-
‘এসেছ? কেমন আছ?’
শেষ বয়সে হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি ঘর নয়।
একটি আপন মুখ।
একটি পরিচিত কণ্ঠ।
আর এমন একটি সম্পর্ক-
যেখানে বয়স হয়ে যাওয়ার পরও মানুষ নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করবে না।
রফিক সরকার/এসএ