ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত থাকলেও ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকের আগমন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে বাংলাদেশ থেকে ৭৪ হাজারের বেশি পর্যটক ভারতে গেছেন।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। বিদেশি পর্যটক আগমনের হিসাবে আগস্টে বাংলাদেশ ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান উৎসদেশ।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশটিতে মোট বিদেশি পর্যটক আগমন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯১ হাজার। ২০২৫ সালের আগস্টে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ ২৫ হাজার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি পর্যটক আগমন বেড়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। এই বৃদ্ধিতে বাংলাদেশি পর্যটকদের আগমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভিসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার মধ্যেও বাংলাদেশ থেকে পর্যটক আগমনের এই বৃদ্ধি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে আগস্টে বাংলাদেশি পর্যটক বৃদ্ধির পেছনে চিকিৎসা, কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা নাকি অবকাশযাপন—কোন কারণের ভূমিকা কতটা, সে বিষয়ে আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে যান। কলকাতা, চেন্নাই, মুম্বাই ও দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের কাছে পরিচিত। এর পাশাপাশি কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখার জন্যও বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি অংশ ভারতে যান।
বিশেষ করে কলকাতার নিউ মার্কেট, গড়িয়াহাটসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে বাংলাদেশি ক্রেতাদের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। দুই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির মিলও কলকাতাকে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, চীন থেকেও ভারতে পর্যটক আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগস্টে চীন থেকে ৯ হাজারের বেশি পর্যটক ভারতে গেছেন, যা ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে পর্যটক আগমন বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ করে। কানাডা, জার্মানি, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা থেকেও পর্যটক আগমন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ও চীন থেকে পর্যটক আগমনের এই বৃদ্ধি ভারতের পর্যটন খাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণে এই দুই দেশের নাগরিকদের ভারতে ভ্রমণে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে আগস্টের পরিসংখ্যানে দুই দেশ থেকেই পর্যটক আগমন বৃদ্ধির বিষয়টি নজর কেড়েছে।
পর্যটন নীতি-সংক্রান্ত সংস্থা ‘অতিথি ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হেমন্ত যোশি এই পরিসংখ্যানকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন। তবে তার মতে, মাত্র এক মাসের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। পর্যটনে ঋতুভেদে পর্যটকের সংখ্যা ওঠানামা করে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
হেমন্ত যোশির মতে, শুধু বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেই পর্যটন খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। পর্যটকরা কত দিন ভারতে অবস্থান করছেন, কত অর্থ ব্যয় করছেন এবং কোন কোন অঞ্চলে ভ্রমণ করছেন-এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণে উৎসাহিত করা গেলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসাসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন খাত উপকৃত হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, আগস্টের প্রাথমিক পরিসংখ্যানে ভারতের বিদেশি পর্যটন বাজারে বাংলাদেশ ও চীনের পর্যটকদের আগমন বৃদ্ধির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে এই বৃদ্ধির ধারা পরবর্তী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এসএ