ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) এসব যুদ্ধবিমান প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালন করবে; হুথিদের ওপর সরাসরি হামলা চালাবে না।
যুক্তরাজ্যের এ সহায়তার মধ্যে রয়েছে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে এ৪০০এম পরিবহন বিমান এবং সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টা পাঠানো। পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামূলক বিমান অভিযানে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাও আরও ৯০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে ইয়েমেনের হুথিরা। এর মধ্যে রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনাও রয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দেওয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় যুক্তরাজ্য সামরিক সহায়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে সম্পর্কের শুরু
যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের সামরিক সম্পর্কের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ কর্মকর্তা পার্সি কক্স ও তৎকালীন নজদের শাসক আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের মধ্যে দারিন চুক্তি হয়। ওই সময় অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন ইবনে সৌদ। বিনিময়ে ব্রিটেন তাঁকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে।
১৯২৭ সালে দুই পক্ষের মধ্যে জেদ্দায় আরেকটি চুক্তি হয়। পরে ১৯৩২ সালে ইবনে সৌদ সৌদি আরবের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েক দশক পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাবেচার মধ্য দিয়ে।
অস্ত্রবাণিজ্য ও ইয়েমেনের যোগসূত্র
১৯৬৬ সালে সৌদি আরব ব্রিটিশ এয়ারক্রাফট করপোরেশনের কাছ থেকে ৪০টি লাইটনিং যুদ্ধবিমান, ২৫টি প্রশিক্ষণ বিমান এবং একটি রাডার ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করে। ওই সময় ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধও দুই দেশের নিরাপত্তা হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থীদের সহায়তা দিচ্ছিল, অন্যদিকে মিসর সমর্থন করছিল প্রজাতন্ত্রপন্থী সরকারকে।
১৯৮৫ সালে দুই দেশ ‘আল-ইয়ামামা’ নামে তেল বিনিময়ে অস্ত্র কেনার চুক্তি করে। এর আওতায় টর্নেডো ও হক যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যবস্থা হয়। চুক্তিসংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাজ্যের সিরিয়াস ফ্রড অফিস ২০০৪ সালে তদন্ত শুরু করলেও ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে তা বন্ধ করে দেয়।
১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করলে সৌদি আরবের অনুরোধে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান দেশটিতে মোতায়েন করা হয়। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সৌদি ঘাঁটি ব্যবহার করে ব্রিটিশ বিমান অভিযান চালায়। পরে দক্ষিণ ইরাকের ওপর নো-ফ্লাই জোন টহলেও সৌদি ঘাঁটি ব্যবহৃত হয়, যা ২০০৩ সাল পর্যন্ত চলে।
টাইফুন যুদ্ধবিমান ও ইয়েমেন যুদ্ধ
২০০৭ সালে সৌদি আরব যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ৭২টি টাইফুন যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি করে। চুক্তিটির মূল্য ছিল ৪৪৩ কোটি পাউন্ড। ২০১৮ সালে আরও ৪৮টি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতার উদ্যোগ নিলেও সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর জার্মানির আপত্তিতে প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালে বার্লিন আপত্তি প্রত্যাহার করে।
ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের কাছে ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রি নিয়ে আইনি বিতর্কও রয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত রায় দেয়, ইয়েমেনে ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অতীতের ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা মূল্যায়ন না করে অস্ত্র বিক্রির লাইসেন্স দেওয়া বেআইনি ছিল। পরে ২০২০ সালে অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স আবার চালু করা হয়।
এদিকে, ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে জাহাজে হুথিদের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থানে হামলায় অংশ নেয় ব্রিটিশ টাইফুন যুদ্ধবিমান। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামূলক বিমান অভিযানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য একটি ভয়েজার ট্যাংকার বিমানও পাঠায় যুক্তরাজ্য।
নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্রিটেনের ভূমিকা আরও বাড়ছে। তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন মোতায়েন করা টাইফুন যুদ্ধবিমান হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালাবে না।
তথ্যসূত্রঃ আল জাজিরা
এস এস