নাম নুরজাহান বেগম। ৬৫ বছর বয়সী কুষ্টিয়ার বাসিন্দা এই বৃদ্ধা একটি মামলার বাদী। তাকে থানায় তুলে নিয়ে এসে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা পুলিশ।
পুলিশের দাবি, কৃষকদলের অফিস ভাঙচুর ও অফিসের মধ্যে থাকা নেতা-কর্মীদের মারধর করে জখমের ঘটনার তদন্তে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এজন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের বাড়ি থেকে নুরজাহান বেগম নামের ওই বৃদ্ধাকে ধরে নিয়ে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিজের বাড়ি ও গুদামে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ছয় দিন আগে আদালতে একটি মামলা করেন নুরজাহান বেগম। সেই মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও কৃষকদলের ২২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫-৩০ জনকে আসামি করা হয়। কয়েকদিন ধরে স্থানীয় বিএনপি নেতারা মামলা তুলে নিতে ওই নারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছেন বলে অভিযোগ।
রোববার সকালে ‘ওসি সাহেব কথা বলবেন’ বলে জানিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা ও পাটিকাবাড়ি পুলিশ ক্যাম্পের একটি যৌথ দল রান্নার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ওই নারীকে তুলে নিয়ে যায়। পরে দুপুরে তাকে কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ এনে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলার আসামি দেখিয়ে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় তাকে।
বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের মেয়ে সেলিনা আক্তার শিল্পী বলেন, ‘সপ্তাহ দুয়েক আগে সামাজিক ও জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আমাদের বাড়িতে ও গুদামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় এলাকার একদল মানুষ। পরে কৃষকদলের স্থানীয় অফিসে নিজেরাই ভাঙচুর করে এলাকার আরও মানুষের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন এ ঘটনায় জড়িত।’
তিনি বলেন, এ ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া আদালতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত এলাকার কিছু মানুষকে আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে।
শিল্পী অভিযোগ করে বলেন, “মামলা করার পর থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। রোববার সকালে মা রান্নাবাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসময় একদল পুলিশ বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তারা মাকে বলে, ‘আপনি আদালতে গুদাম পুড়ানোর মামলা করেছেন। মামলার বাদী আপনি। এ কারণে ওসি সাহেব আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আমাদের সঙ্গে চলুন’-এই বলে কয়েকজন নারী পুলিশ তাকে গাড়িতে তোলে। এরপর নিয়ে যায়। এরপর কোথায় তাকে রাখা হয়েছে জানি না। বাড়িতে ১৫ বছর বসয়ী আমার অটিজম এক কন্যা রয়েছে। মাসহ আমরা তিনজন বাড়িতে ছিলাম।”
নুরজাহানের ছেলে রুহুল আমিন ফোনে বলেন, ‘আমি চাকরি করি। কোনো দল করি না। আমাকে যুবলীগ ট্যাগ দিয়ে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। তারা আমার বাড়ি ও গুদামে আগুন দিয়েছে। আমি পলাতক। পুলিশ আমার বৃদ্ধ মাকে ধরে নিয়ে গেছে। তার কোনো খবর পাচ্ছি না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মামুনুর রশিদ বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অধীন পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের ১ নম্বর নলকুলা কৃষকদলের অফিস ভাঙচুর ও অফিসের মধ্যে থাকা নেতা-কর্মীদের মারধর করে জখমের ঘটনার তদন্তে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নুরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। সেজন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সস্ত্রাস বিরোধী আইনে করা ওই মামলার আসামি হিসেবে আদালতের মাধ্যমে তাকে করাগারে পাঠানো হয়েছে।’
বয়োবৃদ্ধ ওই নারী কৃষকদলের অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় কীভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন-এ প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘আপনারা তাকে (ওই নারীকে) যতটা বৃদ্ধ ভাবছেন, আসলে তিনি ততটা না। যথেষ্ট সবল আছেন। উনি (ওই নারী) আসামিদের কৃষকদলের অফিস ভাঙচুর করতে জিনিসপত্র জোগান দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।’
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে পরে এ বিষয়ে জানাতে পারবেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহম্মেদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজটি সঠিক হয়নি। পুলিশ যদি এ কাজ করে থাকে, তাহলে অবশ্যই এটি নিন্দনীয়।’
টিআইএস