“আগে এক ট্রিপ সাগরে গেলে যে মাছ পাইতাম, তা দিয়ে তেলের খরচ উঠিয়াও সাত দিন ভালোভাবে সংসার চলত। আর এহন হাজার হাজার টাকা দাদন (ঋণ) নিয়ে সাগরে গিয়াও খালি হাতে ফিরতে হয়। চাল-ডাল কেনার টাকা তো দূরের কথা, মহাজনের ঋণের সুদ দেওয়াই দায় হয়ে পড়ছে। সাগরে মাছ ধরে এহন আর সংসার চলে না বাজান।”
চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটের প্রবীণ জেলে নুরহোসেন মাঝি। তাঁর এই হাহাকার কেবল একার নয়; ভোলার দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় চরফ্যাশন-মনপুরার মৎস্যজীবীদের জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভর করে যাদের সংসার চলত, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আজ তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখানকার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে কয়েক হাজার জেলে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে এ পেশায় দিন দিন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ায় অনেকে এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক জেলেই এখন বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।
বিভিন্ন এনজিওর ঋণ ও মহাজনদের দাদন পরিশোধের চাপ, কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়া, একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা—এমনটাই জানিয়েছেন জেলেরা।
সরেজমিনে জেলেদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, অতীতে জেলে পেশা দিয়ে খুব ভালোভাবেই সংসার চলত। এখন এ পেশার পাশাপাশি অন্য কাজ না করলে তিনবেলা খাবারের ব্যবস্থা হয় না। সাগরে মাছ না থাকায় অনেক সময় লোকসানে পড়তে হয়। তাই তারা বিকল্প পেশা খুঁজছেন।
উপজেলার চরকুকরি এলাকার জেলে বাবুল মাঝি বলেন, “আমি ৪০ বছর ধরে এ পেশায় আছি। আগে যখন তেলের দাম কম ছিল, তখন ভালোই লাভ হতো। কিন্তু এখন তেলের দাম চড়া। এতে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। সাগরে মাছ ধরে এখন আর সংসার চলে না। তাই বাধ্য হয়েই অন্য কাজ করতে হয়।”
জেলে ফোরকান মিয়া বলেন, “সব মালামালের দাম বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল, বরফ—সবকিছুই বেশি দামে কিনতে হয়। এভাবে জীবন চালানো কষ্টকর। মাছ ধরার মৌসুম থাকে পাঁচ মাস। এর মধ্যে আড়াই মাসই থাকে নিষেধাজ্ঞা। বাকি আড়াই মাসে ঝড়ঝাপটা ও বৈরী আবহাওয়া থাকে। এখন শুধু জেলে পেশা দিয়ে সংসার চালানোর মতো কোনো উপায় নেই। তাই অন্য পেশা খুঁজছি।”
উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ের জেলে আনোয়ার এবং বেতুয়ার মেঘনা নদীর পাড়ের সামরাজ এলাকার জেলে নুরুল্লাহ মিয়া বলেন, “সাগরে ইলিশ তেমন পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে অনেক ইলিশ ওঠে। কিন্তু আগে সাগরের কিছু পয়েন্টে নিয়মিত মাছ পাওয়া যেত। এখন আর সেসব পয়েন্টেও মাছ নেই। তার মধ্যে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ নানান প্রতিকূলতা তো আছেই। এই পেশায় এখন লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। সাগর থেকে এসেও আমাদের অন্য কাজ খুঁজতে হয়। তার চেয়ে জেলে পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়াই ভালো। অন্য পেশায় অন্তত নিশ্চিত থাকা যায় যে দিন শেষে কিছু হলেও মজুরি পাব।”
এ ব্যাপারে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, দুর্যোগসহ মানবসৃষ্ট নানান কারণে মাছের উৎপাদন কমেছে। এসব কারণে নদী-সাগরের মাছের বিচরণ ও প্রজননের জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে। গত কয়েক দশকে জেলেদের তুলনায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় সাগর ও নদ-নদীতে চাপ বেড়েছে। জেলেদের এ পেশার পাশাপাশি আর্থিক স্বচ্ছলতার লক্ষ্যে আমাদের বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।”
প্রসঙ্গত, চরফ্যাশন উপজেলায় চারটি থানায় মোট ৪৩ হাজার ৩০০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। এদের মধ্যে ২৫ হাজার জেলে জেলে কার্ড পেয়েছেন। ইলিশের প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞার সময়ে দরিদ্র ৩৫ হাজার ৩৮৬ জেলেকে চাল সহায়তা দেওয়া হয়। এছাড়াও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার জেলেকে বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টির লক্ষ্যে বকনা বাছুর বিতরণ করা হয়।
এসএফ/আরএন