চীনের কিশোর-কিশোরীরা চলতি মাসের শুরুতে স্কুলে ফেরার পর নতুন বাধ্যতামূলক পাঠ্যতালিকায় জায়গা পেয়েছে উনিশ শতকের ব্রিটিশ উপন্যাস ‘জেন আয়ার’। একসময় উপন্যাস, পরে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়া শার্লট ব্রন্টের এই প্রেমকাহিনি এবার চীনের ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পাঠ্য।
নারীর স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার কাহিনি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত উপন্যাসটির চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি অনেকের কাছে বিস্ময়কর। তবে বেইজিং বইটিতে দেখছে অন্য একটি বার্তা। সত্যিকারের ভালোবাসা ও সুস্থ মূল্যবোধের গুরুত্ব।
রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র বেইজিং ডেইলি বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে চেহারা ও সম্পদ নিয়ে তৈরি ‘অগভীর ধারণার’ বিপরীতে ‘জেন আয়ার’ তরুণদের ভালোবাসা ও সম্পর্ক সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।
চীনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন উপন্যাস ও ক্ষুদ্র ধারাবাহিকে অঢেল সম্পদের প্রদর্শন, নিপীড়িত প্রেমিক-প্রেমিকা, ধনকুবের এবং প্রতিশোধপরায়ণ প্রেমিকার মতো অতিরঞ্জিত কাহিনি জনপ্রিয় হয়েছে। এসব বিষয়বস্তু নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশটির নিয়ন্ত্রকেরাও।
গত জুনে সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ক্ষতিকর ও নিম্নরুচির’ বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এসব কাহিনি সম্পর্ক ও বিয়ে সম্পর্কে ‘বিকৃত’ ধারণা ছড়াচ্ছে।
বেইজিং ডেইলির মতে, অনাথ জেন আয়ারের জীবনসংগ্রাম, আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত তার ধনী নিয়োগকর্তার প্রেমে পড়ার কাহিনি কিশোরদের ‘সুস্থ মূল্যবোধ’ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
পত্রিকাটি আরও বলেছে, কিশোর-কিশোরীরা যখন প্রথম প্রেমের অনুভূতির মুখোমুখি হয় এবং তখনো অনভিজ্ঞ ও সরল থাকে, তখন সুস্থ চরিত্র গঠনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
১৮৪৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটি ১৯২৫ সালে চীনে প্রথম প্রকাশের পর থেকেই ব্যাপক জনপ্রিয়। পরে এটি বহুবার অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে; মঞ্চ ও চলচ্চিত্রেও রূপ পেয়েছে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালে একটি ব্রিটিশ চলচ্চিত্রও চীনের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়।
জেন আয়ার চরিত্রটি চীনের শ্রমজীবী শ্রেণির কাছে দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়নবিরোধী প্রতীক হিসেবে পরিচিত। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কাছেও উপন্যাসটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণযোগ্য।
তবে পাঠ্যক্রমে বইটির অন্তর্ভুক্তি এমন সময়ে হয়েছে, যখন চীনে নারীবাদী আলোচনা ও সক্রিয়তার বিভিন্ন রূপ ক্রমবর্ধমান নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়ছে।
বইটি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে। তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে ওঠা বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা উপন্যাসটির গভীর ও জটিল প্রেমের কাহিনির সঙ্গে কতটা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে, তা নিয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিয়াওহংশুতে এক অভিভাবক লিখেছেন, তাঁর ছেলে প্রশ্ন করেছে ‘জেন আয়ার’ পড়ানো কি তার শ্রেণির মেয়েদের শেখানো হচ্ছে যে তাদের জীবন ও সিদ্ধান্ত প্রেমের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত?
জেন কেন একজন অন্ধ পুরুষকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও তাঁর ছেলে বুঝতে পারেনি বলে জানান ওই অভিভাবক। তার কাছে পুরো বিষয়টিই ‘লোকসানের চুক্তি’র মতো মনে হয়েছে।
তবে বেইজিংয়ের চীনা সাহিত্যের সাম্প্রতিক স্নাতক ছাত্রী ছিন শিওয়েন মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষায় ‘জেন আয়ার’-এর মতো ধ্রুপদি সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, চীনের মৌলিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশোনা ও উচ্চ ফলাফলের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হলেও ভালোবাসা ও চরিত্র গঠনে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে উপন্যাসটি সমালোচনার ঊর্ধ্বেও নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বইটির ‘পাগল নারী’ চরিত্রের উপস্থাপন এবং এর অন্তর্নিহিত ঔপনিবেশিকতার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বেইজিংয়ের ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের গবেষক ইয়ান হাইরং বলেন, উপন্যাসের ‘চিলেকোঠার পাগল নারী’ চরিত্রের উপস্থাপন এবং এর অন্তর্নিহিত ঔপনিবেশিকতার বিষয়গুলো বিবেচনা করলে বইটি নিয়ে তাঁর উদ্বেগ রয়েছে।
এফএস