নাটোরের বড়াইগ্রামে চলতি মৌসুমে সরকারি গম সংগ্রহ অভিযান শেষ হলেও এক ছটাক গমও সংগ্রহ করতে পারেনি উপজেলা খাদ্য বিভাগ। গত ৩ মে শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট শেষ হওয়া এ অভিযানে ৮২০ টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারি ক্রয়মূল্য খোলাবাজারের চেয়ে কম এবং জটিল নিয়মনীতি থাকায় কৃষকেরা সরকারি খাদ্যগুদামে গম বিক্রি করেননি।
শুধু চলতি মৌসুমেই নয়, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও বড়াইগ্রামে সরকারি গম সংগ্রহের একই চিত্র ছিল। অর্থাৎ টানা চার বছর ধরে সরকারি গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ তো দূরের কথা, এক কেজি গমও সংগ্রহ করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ।
উপজেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বড়াইগ্রামে প্রায় ১২ হাজার কৃষক ৪ হাজার ৬৫৬ হেক্টর জমিতে গম চাষ করেছেন। এতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৭৯০ টন গম। বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের পরও সরকারি খাদ্যগুদামে গম না আসায় বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি কেজি গমের সরকারি ক্রয়মূল্য ২ টাকা বাড়িয়ে ৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে খোলাবাজারে বর্তমানে প্রতি মণ গম ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সরকারি দরের তুলনায় খোলাবাজারে মণপ্রতি প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি গুদামে গম বিক্রি করতে হলে গমের আর্দ্রতার মাত্রা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশের মধ্যে রাখার শর্ত রয়েছে। অথচ খোলাবাজারে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত আর্দ্রতার গমও ব্যবসায়ীরা কিনে নিচ্ছেন। ফলে কৃষকদের কাছে খোলাবাজারই বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে গম নিয়ে গেলে পরিবহন, কুলি ও পরিমাপসহ বিভিন্ন খরচে মণপ্রতি আরও ৫০ থেকে ৬০ টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের প্রক্রিয়াগত ঝামেলা। এসব কারণে লোকসান ও হয়রানি এড়াতে কৃষকেরা খোলাবাজারে গম বিক্রি করছেন।
মাঝগাঁও এলাকার গমচাষি আবুল হোসেন বলেন, ‘বাজারে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভালো দামে নগদ টাকা পাওয়া যায়। গুদামে যদি বাজারদরের চেয়ে মণপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দেওয়া হতো, তাহলে কৃষকেরা অবশ্যই সরকারি গুদামে গম দিতেন।’
চকপাড়া এলাকার গম ব্যবসায়ী লালন হোসেন বলেন, ‘এক থেকে দেড় মাস আগেও বাজারে গমের দাম মণপ্রতি ১ হাজার ৪০০ টাকা ছিল। তখন খাদ্য বিভাগ উদ্যোগ নিলে সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হতো।’
বড়াইগ্রাম খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবা পারভীন বিথী বলেন, ‘সরকারিভাবে প্রতি কেজি গমের নির্ধারিত দাম ৩৬ টাকা, যা খোলাবাজারের চেয়ে ৫ থেকে ৬ টাকা কম। এ কারণে কৃষকেরা গুদামে গম দেননি।’
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা কাজী ডালিম বলেন, সরকারি দরের চেয়ে খোলাবাজারে দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকেরা গুদামে গম বিক্রি করেননি। তবে ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত ৩৬৭ জন কৃষকের মধ্যে ১৬৭ জনের কাছ থেকে ধান এবং চুক্তিবদ্ধ আটটি অটোমিল ও ২২টি হাসকিং মিল থেকে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হয়েছে।
উপজেলা গম, ধান ও চাল সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, টানা চার বছর ধরে বড়াইগ্রামে সরকারি গম সংগ্রহে ব্যর্থতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। একই সঙ্গে বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে বাস্তবসম্মত সরকারি ক্রয়মূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও তুলে ধরা হবে।
এএইচ/আরএন