ইসলাম ‘অবমাননা’ রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন পাস এবং কোরআন সুন্নাহর সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ কোনো আইন না করাসহ ৯ দফা দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোববার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে ৯ দফা দাবি সম্বলিত ওই চিঠি প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হয়।
সরকারপ্রধানের আগমন উপলক্ষে এদিন মাদ্রাসায় সংবর্ধনা ও মত বিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামবাদী ৯ দফা দাবির বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে জানান।
তিনি বলেন, “৯ দফা দাবি জানিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এসেছি। আমরা ইসলামের পক্ষে।’ হেফাজতে ইসলামের আমির উনাকে দোয়া করেছেন।”
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মুহাম্মাদ সাজিদুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, “আপনার (প্রধানমন্ত্রী) ফটিকছড়ি সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়; এটি দ্বীন ও রাষ্ট্রের মেলবন্ধনের এক অনন্য স্মারক।”
৯ দফা দাবি
প্রধানমন্ত্রীকে ‘জননেতা’ সম্বোধন করে চিঠিতে যে ৯ দফা দাবি জানানো হয় তার মধ্যে প্রথম দাবিটি হল, “মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কুরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা।”
পাশাপাশি কুরআন সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করার দাবিটি দুই নম্বরে রাখা হয়েছে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ‘রাতের আঁধারে নৃশংস গণহত্যায়’ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তৃতীয় দাবিতে ২০২১ সালের মোদীবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের ‘নারকীয় হত্যাযজ্ঞে’ জড়িত, হুকুমের আসামি ও ‘খুনিদের’ বিচার নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ‘ন্যায়বিচার কায়েম করার’ দাবি জানানো হয়েছে।
দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে ৪ নম্বরে। তা করা হলে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করছে হেফাজতে ইসলাম।
পাশাপাশি সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ধর্মীয় শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্সের সমমান) ডিগ্রির কথা রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিগুলোর ‘ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা’ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
আলেমদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ‘মিথ্যা’ মামলাগুলো প্রত্যাহার করে এদেশের আলেম-ওলামাদের ‘রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার’ করার দাবি রয়েছে আট নম্বরে।
সবশেষ দফায় ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে আগমনে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পাশাপাশি এবং টঙ্গী ময়দানের বিশ্ব ইজতেমায় তার অনুসারীদের অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ার দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছে হেফাজতে ইসলাম।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রশংসা
প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে তার পিতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রশংসা করেন হেফাজত নেতৃবৃন্দ।
চিঠিতে বলা হয়, “ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আপনার শ্রদ্ধেয় পিতা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন করে এবং জাতীয় রাজনৈতিক ধারায় ইসলামী মূল্যবোধকে সম্মানের স্থানে বসিয়ে এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছিলেন।”
পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সর্বদা এদেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ‘গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সমমর্মিতা’ প্রদর্শন করেছেন বলে চিঠিতে স্মরণ করা হয়।
সেখানে বলা হয়- “জাতীয় সংকটকালে, বিশেষ করে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহমর্মিতা আলেম সমাজ আজও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে।
“শহীদ জিয়া পরিবারের সাথে এদেশের আলেমসমাজ ও তৌহিদী জনতার এই যে আত্মিক ও নৈতিক বন্ধন, তা কেবল রাজনীতির সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক সুদৃঢ় প্রাচীর।”
চিঠিতে বলা হয়, “আজ আপনি যখন জাতীয় নেতৃত্বের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়ে এদেশের আলেম সমাজের প্রধান মুরুব্বি আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এর সঙ্গে সাক্ষাত করতে জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরের এই দ্বীনি আঙিনায় উপস্থিত হয়েছেন, তখন আমরা অনুধাবন করতে পারছি যে, ঐতিহ্যগত সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা আরও জোরদার ও সুসংহত হচ্ছে।
“আপনার এই সফর প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং উলামায়ে কেরামের সৎ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার গুরুত্ব অপরিহার্য।”
বর্তমানে বাংলাদেশ ‘নতুন এক সম্ভাবনার দোরগোড়ায়’ দাঁড়িয়ে আছে মন্তব্য করে চিঠিতে বলা হয়, দেশের এই পরিবর্তনশীল সময়ে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কোনো দেশ তার নিজস্ব ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও আলেম সমাজকে দূরে ঠেলে অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না।
“রাষ্ট্র পরিচালনায় আলেম-ওলামার প্রজ্ঞা ও দিকনির্দেশনা যুক্ত হলে দেশে ইনসাফ, সাম্য, শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে।”
প্রধানমন্ত্রী বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছালে তাকে সাদরে বরণ করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরী। এসময় দুজনকে হাসিমুখে কোলাকুলি ও করমর্দন করতে দেখা যায়।
মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে আয়োজিত মত বিনিময় সভায় মোনাজাত পরিচালনা করেন হেফাজতে ইসলামের আমির। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসময় উপস্থিত ছিলেন।
টিআইএস