মিয়ানমার থেকে বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধি দল। সফরকালে তারা রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার প্রতিনিধি দলের কাছে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিকেলে কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন শেষে এসব তথ্য জানান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য বিদেশি সহায়তা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা দেশ হিসেবে সহায়তা দিয়ে আসছে। এই সফরের মাধ্যমে ভবিষ্যতেও সেই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে—এমন একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিনিধি দল শুধু রোহিঙ্গা শিবিরের মানবিক পরিস্থিতিই নয়, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে স্থানীয় জনগণের ওপর কী ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে, সেটিও সরেজমিনে দেখেছে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে নতুন করে অনুপ্রবেশের বিষয়েও তারা জানতে চেয়েছে। রাখাইন রাজ্যে চলমান বিমান হামলাসহ সাম্প্রতিক পরিস্থিতির বিষয়েও প্রতিনিধি দলকে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আবারও জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় জনগণের মনোভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, প্রায় নয় বছর ধরে এত বড় মানবিক বোঝা বহন করা স্থানীয় জনগণের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, প্রতিনিধি দল শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে, তারাও নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে তিন লাখ মানুষ প্রত্যাবাসনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে—এমন তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো সরকারি তথ্য নেই। তবে প্রতিনিধি দল বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে।
এর আগে শুক্রবার সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছে সড়কপথে উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধি দলে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনও ছিলেন।
কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে দলটির সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে রওনা দেন। দুপুর দেড়টার দিকে উখিয়া উপজেলা সদরে পৌঁছে তারা নর্থ এন্ড ক্যাফেতে চা-বিরতিতে অংশ নেন। পরে দুপুর ২টার দিকে প্রতিনিধি দলটি উখিয়ার ৮-ডব্লিউ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছায়।
ক্যাম্পটির ওয়াচ টাওয়ার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন মার্কিন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। প্রায় ২০ মিনিট পর্যবেক্ষণের পর তারা ৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) পরিচালিত হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা হাসপাতালের রোগী, নার্স ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন।
এরপর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধি দলটি উখিয়ার ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইউএনএইচসিআর পরিচালিত নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) কেন্দ্র পরিদর্শনে যায়। সেখানে দলটির সদস্যরা কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন এবং সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেন।
পরে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে উখিয়ার ৪-এক্সটেনশন নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) পরিচালিত খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে যান। সেখানে তারা খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম পরিদর্শনের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সংস্থাটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সার্বিক পরিদর্শন কার্যক্রম শেষে বিকেল পৌনে ৫টায় উখিয়া উপজেলা সদরের নর্থ এন্ড ক্যাফেতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন তারা।
এর আগে তিন দিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ঢাকায় পৌঁছান মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর। একই দিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হচ্ছে। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান, নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
তিন দিনের সফরের শেষ দিনে শনিবার (১ আগস্ট) সকালে প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
জিএম/আরএন