ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক জোটে ভাঙনের আভাস মিলছে। ইতোমধ্যে খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এবার জোটে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
দলটির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকার রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিকল্প জোট গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
দলটির নেতাদের ভাষ্য, এনসিপির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিজস্ব নেতৃত্বে একটি বড় জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তাদের ধারণা, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলে সেই পরিসর সীমিত হতে পারে। নতুন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে সেখানে নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হবে।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’র আওতায় ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট একত্রিত করার উদ্যোগে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে। পরে এনসিপি, এবি পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হলে সেটি ১১ দলীয় জোটে পরিণত হয়। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বাচনের আগেই জোট ছাড়ে। এরপর নির্বাচন শেষে নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে শরিকদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
গত ২৫ জুলাই খেলাফত মজলিসের জোট ত্যাগের পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, এরই মধ্যে কওমি ধারার কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচার প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য নতুন জোটে এনসিপির ভূমিকা কী হতে পারে, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের এক সদস্য জানান, জুলাই মাসের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দলীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতিও জোরদার করেছে এনসিপি। ইতোমধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে দলটি। পাশাপাশি উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েও প্রার্থী বাছাই চলছে।
বর্তমান ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তরে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী করা হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা, রাজশাহী ও সিলেটেও প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে দলীয় সূত্রের দাবি, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হলে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
এদিকে ইসলামপন্থী দলগুলোকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বাবুনগরে সাতটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশ নেওয়া দলগুলোকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐক্যের প্রস্তাব লিখিতভাবে জমা দিতে বলা হয়েছে।
বৈঠকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এনসিপিও এ উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং কয়েকটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নিয়েছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা চলছে এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, এনসিপির নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তারা নতুন উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের ভেতরে কোনো মতপার্থক্য থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। এনসিপির ভবিষ্যৎ অবস্থান তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয় পর্যায়ে সমঝোতা হয়েছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমঝোতার বিষয়টি স্থানীয় বাস্তবতার ওপর নির্ভর করবে।