রাজধানীর প্রথম পাতাল মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের ডিপো নির্মাণের কাজ চীনের প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের উড়াল অংশ নির্মাণের কাজও আরেকটি চীনা যৌথ উদ্যোগের হাতে যাচ্ছে। দুটি প্রস্তাবই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির ব্যয় ১০০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে।
লাইন-১-এর ডিপো নির্মাণে ব্যয় ৪ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ প্রকল্পের ডিপো নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২৮৫ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৫৫৮ টাকা। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) যৌথভাবে প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে।
দরপত্র মূল্যায়নে সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগ সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল দর ছিল ৩ হাজার ৩৫৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ভ্যাট, উৎসে আয়কর ও কাস্টমস শুল্ক যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভ্যাট ও কর বাদ দিলে সুপারিশকৃত দর দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ কম, যা সরকারের জন্য ব্যয় সাশ্রয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ডিপো নির্মাণ প্যাকেজের আওতায় ওয়ার্কশপ, স্ট্যাবলিং শেড, অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার, কারিগরি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র, ট্র্যাকশন সাবস্টেশন, সহায়ক অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হবে।
সময়মতো শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর এবং কাজ শুরু হবে।
এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং জাইকার ঋণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
প্রকল্পের আওতায় কমলাপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার পাতাল মেট্রোরেল এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণ করা হবে।
লাইন-৫-এর উড়াল অংশেও চীনা যৌথ উদ্যোগ
এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের তৃতীয় নির্মাণ প্যাকেজের আওতায় ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়াল মেট্রোরেল এবং পাঁচটি উড়াল স্টেশন নির্মাণের কাজও চীনের রেলওয়ে গ্রুপ, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ যৌথ উদ্যোগকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ প্যাকেজের চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬৭০ কোটি ৯৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৬০ টাকা। ভ্যাট ও কর ছাড়া তাদের দর ছিল ২ হাজার ২৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, যা দাপ্তরিক প্রাক্কলনের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি হলেও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এই প্যাকেজের আওতায় হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত প্রায় ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং নতুন বাজারের পর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ০ দশমিক ৯ কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণের পাশাপাশি হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারায় পাঁচটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে।
জাইকার অনাপত্তি, অপেক্ষা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উভয় প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন জাইকার ক্রয় নির্দেশিকা ও সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে। প্রাক-যোগ্যতা, কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক মূল্যায়ন ও দর-কষাকষির প্রতিটি ধাপে জাইকার অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়েছে এবং মূল্যায়ন কমিটির কোনো সদস্য ভিন্নমত দেননি।
লাইন-৫ প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল মতিন চৌধুরী বলেন, জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির সংশ্লিষ্ট প্যাকেজে চীনা যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে জাইকার কোনো আপত্তি নেই। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্স গ্যারান্টি যাচাই শেষে চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন সব নির্মাণ প্যাকেজের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে। বর্তমানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজের কাজ এখনো বাকি রয়েছে। সবগুলো প্যাকেজ সমন্বিতভাবে এগোলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
এসআর