ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
মহেশখালী ঘিরে তিন পরাশক্তির রশি টানাটানি
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪১ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট এক দ্বীপাঞ্চল মহেশখালী। এত দিন যেখানে ছিল মার্কিন কোম্পানির একচ্ছত্র আধিপত্য, সেখানে এবার ভাগ বসাতে ছক কষছে পুতিনের দেশ রাশিয়া। আমেরিকা, রাশিয়া আর মাঝে চীন-বিশ্বের তিন পরাশক্তি এখন মুখিয়ে আছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারের দখল নিতে। একদিকে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বছরে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের চড়া আমদানির ধাক্কা, অন্যদিকে দুই পরাশক্তিকে একই স্থানে ব্যবসা করতে দেওয়া নিয়ে চরম ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন। 

রাশিয়ার প্রস্তাব

বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দিন দিন কমে আসছে। ফলে বাধ্য হয়ে প্রতি মাসে আমাদের প্রায় ১০ কার্গো এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। খোলাবাজার থেকে এই গ্যাস কিনতে মাসে খরচ হচ্ছে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা। এই সংকটের সুযোগই কাজে লাগাতে চাইছে রাশিয়ার মালিকানাধীন সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসি। গত ৩ সেপ্টেম্বর তারা পেট্রোবাংলার কাছে ৯৫০ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দেয়।
বর্তমানে মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বড় কোনো ঢেউ ও ঝড় এলে দুলতে থাকে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই দুই টার্মিনালে এলএনজি খালাস মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কিন্তু রাশিয়া সমুদ্রের তলদেশে কংক্রিট বসিয়ে একটি স্থায়ী গ্র্যাভিটি-বেইজড স্ট্রাকচার (জিবিএস) টার্মিনাল বানাতে চায়, যেটি ৬০ থেকে ৮০ বছর স্থায়ী হবে এবং এতে পুরো ১ মাসের গ্যাস সংরক্ষণ করা যাবে।

নোভাটেকের প্রস্তাবে দেশের অভ্যন্তরে এলএনজি সরবরাহ করতে দুটি অপশনের কথা বলা হয়েছে। প্রথম অপশনটি হচ্ছে, আমদানিকৃত এলএনজিকে রিগ্যাসিফাই করে, অর্থাৎ পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে, সমুদ্রের নিচে স্থাপিত বড় সাব-সি পাইপলাইনের মাধ্যমে তা জাতীয় গ্রিডে পাঠানো।

নোভাটেকের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় অপশনটি হচ্ছে, সমুদ্রের নিচ দিয়ে বড় বড় পাইপলাইন না বানিয়ে তারা ছোট ছোট জাহাজে করে এই গ্যাস সরাসরি মেঘনাঘাট, আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল ও ভেড়ামারা জলপথ দিয়ে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও সার কারখানায় পৌঁছে দেবে।

আমেরিকার আধিপত্য ও বৈরিতা

খাতা-কলমে রাশিয়ার এই প্রস্তাব বেশ লোভনীয় ও সাশ্রয়ী মনে হলেও মূল ঝামেলাটা ঠিক এই জায়গাতেই। বর্তমানে মহেশখালীর সমুদ্রে চালু থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ মূলত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির হাতে। মনে রাখা প্রয়োজন, এই দুটির একটির মালিকানায় আছে সামিট গ্রুপ, তবে এটি পরিচালনা করে এক্সিলারেট। এখন ঠিক সেই একই জায়গায় যদি রাশিয়ান কোম্পানি স্থায়ী টার্মিনাল বানাতে চায়, তবে বঙ্গোপসাগরের একই পয়েন্টে মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দুই প্রতিপক্ষ-আমেরিকা ও রাশিয়া।

বড় আইনি ও কূটনৈতিক বাধা

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি। চুক্তির কিছু শর্ত অনুসারে, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন বা সম্মতির একটা বাধ্যবাধকতা বা স্পর্শকাতর জায়গা থেকে যায়। ফলে রাশিয়ার এই প্রস্তাবে সায় দেওয়া মানে সরাসরি ওয়াশিংটনের চোখরাঙানির মুখোমুখি হওয়া।

চীনের প্রবেশ 

মার্কিন ও রুশ দ্বৈরথের মাঝখানে কিন্তু চীনও বসে নেই। পেট্রোবাংলা সূত্র জানাচ্ছে, চীনও পিছিয়ে নেই এই দৌড়ে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) জুনের শেষ দিকে মহেশখালীতেই প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের উপযোগী আরেকটি ভাসমান টার্মিনাল তৈরির প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে।

যদি রাশিয়ার প্রকল্প কার্যকর হয়, তবে এটি হবে বাংলাদেশের চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল। অর্থাৎ, বঙ্গোপসাগরের ছোট্ট মহেশখালী কেন্দ্রিক এই অঞ্চলে এখন একদিকে মার্কিন এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যদিকে চীনা সিএনইই, আর নতুন করে প্রবেশ করতে যাচ্ছে রাশিয়ার মালিকানাধীন নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসি। একই অঞ্চলে তিন পরাশক্তির বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাংলাদেশকে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক চাপের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

নোভাটেক বিতর্ক

পুরো প্রস্তাবটিতে কিন্তু একটি বড় টুইস্টও লুকিয়ে আছে। পেট্রোবাংলায় প্রস্তাব জমা দেওয়া নোভাটেক মিডলইস্টের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, এই ধরনের জিবিএস টার্মিনাল তৈরির সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতা তাদের নেই। তবে তাদের লোগো, নাম এবং কর্মকর্তাদের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট জানা গেছে-এটি মূলত রাশিয়ার মূল নোভাটেক কোম্পানিরই একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত শাখা। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বা কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে তারা দুবাইয়ের নাম ব্যবহার করে প্রস্তাবটি জমা দিয়েছে।

পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাচ্ছেন না। তাঁদের বক্তব্য, প্রেজেন্টেশন তো অনেকেই দিতে পারে, চুক্তি তো আর হয়নি। কিন্তু সত্যিটা হলো, মহেশখালীকে কেন্দ্র করে তিন আন্তর্জাতিক পরাশক্তির জলঘোলা করা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করার আগে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করে আমাদের দেখতে হবে, আমাদের কোনো ঝুঁকি আছে কি না। এক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে তিনি মনে করেন, এ রকম স্থায়ী মেগা-টার্মিনাল রাশিয়ার মতো বিদেশি কোম্পানির হাতে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় খরচে পেট্রোবাংলারই করা উচিত।

তবে এক্ষেত্রে সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম। সংকটের সময় ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে নিয়মিত জ্বালানি তেল কিনেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসংক্রান্ত পুরো বিষয়টি সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে, তার ওপরই নির্ভর করবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ লাভবান হবে, নাকি আমেরিকা-রাশিয়ার মতো কোনো পরাশক্তি।

দিনশেষে বাংলাদেশের প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী গ্যাস। কিন্তু সেই গ্যাস আনতে গিয়ে যেন আমরা আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত বাণিজ্যযুদ্ধের বলি না হই। একদিকে শিল্পকারখানা বাঁচাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। 

টিআইএস
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement