ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
গ্যাসের লাইনে রাত, রাস্তায় ভাড়ার চাপ: ঢাকার পরিবহন সংকটের নতুন চিত্র
✎ অবজারভার অনলাইন ডেস্ক
⏲ প্রকাশিত: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

সন্ধ্যা নামলেই ঢাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে শুরু হচ্ছে অপেক্ষার আরেক গল্প। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত গ্যাস। সেই সংকটের প্রভাব পড়ছে নগরীর রাস্তায়-কমছে সিএনজিচালিত অটোরিকশার প্রাপ্যতা, বাড়ছে ভাড়া। এমনকি অ্যাপভিত্তিক পরিবহনেও যাত্রীকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।

ঢাকার রাত থামে না। অফিসফেরত মানুষের ভিড়, দোকানের আলো, রাস্তায় গাড়ির সারি-সব মিলিয়ে রাতের রাজধানীও থাকে ব্যস্ত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ব্যস্ত শহরের আরেকটি দৃশ্যও ক্রমেই চোখে পড়ছে-সিএনজি স্টেশনের সামনে দীর্ঘ গাড়ির সারি।

শুক্রবার রাত ৯টা। রায়েরবাগের ইউনাইটেড ফিলিং স্টেশনের সামনে তখন গাড়ির দীর্ঘ লাইন। একটির পেছনে আরেকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কেউ প্রাইভেট কার নিয়ে, কেউ সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। কারও অপেক্ষা এক ঘণ্টার, কারও কয়েক ঘণ্টার।

রাত ১০টার পর গ্যাস দেওয়া শুরু হলো। ততক্ষণে স্টেশনের সামনে গাড়ির সারি ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার।

ঢাকার জন্য এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দৃশ্য নয়।

রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে সন্ধ্যার পর গাড়ির সারি দীর্ঘ হতে থাকে। কোথাও গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় রাত ১২টা কিংবা ১টা পর্যন্ত। দিনের বেলাতেও একই চিত্র—সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুরে গিয়ে গ্যাস পাওয়ার অভিযোগ করছেন চালকেরা।

অর্থাৎ, একটি গাড়ি রাস্তায় যতটা সময় থাকার কথা, তার বড় একটি অংশ এখন কেটে যাচ্ছে গ্যাস স্টেশনের লাইনে।

গ্যাস আছে, কিন্তু কতক্ষণ?

ইউনাইটেড ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী রাসেল বলছিলেন, সেদিন গ্যাসের চাপ তুলনামূলক ভালো ছিল।

‘আজ গ্যাসের চাপ ভালো। কতক্ষণ ভালো থাকে, সেটাই দেখার বিষয়,’ তিনি বলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, চাপ ওঠার পর প্রথম দেড় থেকে দুই ঘণ্টা তুলনামূলক ভালো গ্যাস পাওয়া গেলেও পরে চাপ কমে যায়। ফলে অপেক্ষমাণ গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

প্রাইভেট কার চালক মিলন মিয়াও সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছিলেন।

‘এই পাম্পে গ্যাসের চাপ ভালো পাওয়া যায়। এ কারণে নিয়মিত এখানে আসি। সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করছি, দেখি কখন পাই।’

একজন চালকের এই অপেক্ষা শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প নয়। গ্যাসের সরবরাহ ও চাপের অনিশ্চয়তা এখন নগর পরিবহনের সময়সূচির পাশাপাশি চালকদের আয়েও প্রভাব ফেলছে।

মেরুল বাড্ডার জামান ফিলিং স্টেশনের কর্মী জোবায়ের বলেন, রাতে কিছুটা গ্যাসের চাপ পাওয়া যায়, তবে তা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় না।

ফলে দিনের একটি অংশ গাড়ি চালিয়ে আয় করা এবং আরেকটি অংশ গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে কাটানো-এই বাস্তবতার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে চালকদের।

‘সিএনজি আছে, কিন্তু রাস্তায় নেই’

এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে রাজধানীর সড়কে।

সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। রাস্তায় গাড়ি কমে যাওয়ায় যে অটোরিকশাগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর অনেক চালকই নির্ধারিত বা প্রচলিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা চাইছেন।

ডেমরার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলামের অভিজ্ঞতাটি সেই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।

বাবাকে নিয়ে মিরপুরে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফেরার পথে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর একটি অটোরিকশা পাওয়া গেলেও চালক দাবি করেন দ্বিগুণ ভাড়া।

চালকের যুক্তি ছিল—গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার গাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না।

বনশ্রীর বাসিন্দা হাফিজুর রহমানের অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর দাবি, বনশ্রী থেকে গুলশানে যেতে আগে যেখানে প্রায় ২০০ টাকা ভাড়া লাগত, এখন সেখানে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।

বাড্ডার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, বাড্ডা থেকে কারওয়ান বাজার যেতে আগে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লাগলেও এখন ৩০০ টাকার বেশি চাওয়া হচ্ছে।

‘গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি কমে গেছে, একই সঙ্গে ভাড়াও বেড়েছে,’ বলেন তিনি।

চালকেরও আছে হিসাব

যাত্রীদের কাছে বাড়তি ভাড়া নিঃসন্দেহে বাড়তি বোঝা। তবে চালকদের বাস্তবতাটিও আলাদা নয়।

সিএনজি অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ মিল্লাত বলছেন, গ্যাস সংকটের পর নিয়মিত গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

‘দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে গ্যাস নিতে হচ্ছে। যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে খরচ মিটিয়ে নিজের জন্য কিছু থাকছে না।’

কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘সিএনজি চালালেই সংসার চলে, না চালালে চলে না। খুব সংকটের মধ্যে আছি।’

সমস্যার আরেকটি দিক হলো গাড়ির মালিককে দেওয়া দৈনিক জমা। গ্যাস সংকট থাকলেও সেই জমা কমছে না।

‘যতটুকু ভাড়া পাচ্ছি, একটু বেশি না নিলে আমরাও টিকতে পারছি না। মালিকের গাড়ির জমা তো আর কমেনি।’

এখানেই সংকটটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যাত্রীর প্রশ্ন-ভাড়া কেন বাড়বে? চালকের পাল্টা যুক্তি-খরচ না উঠলে গাড়ি চালাবেন কীভাবে?

দুই পক্ষের এই টানাপোড়েনের মাঝখানেই আটকে আছে বৃহত্তর নগর পরিবহনব্যবস্থা।

‘আমরা এতদূর গিয়ে রিকশা চালাই’

অটোরিকশাচালক জামাল মোল্লার বক্তব্যেও উঠে আসে একই বাস্তবতা।

তার যুক্তি, রাস্তায় সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে গাড়ি নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে চালকদেরও গাড়ি নিয়ে যেতে হচ্ছে তুলনামূলক দূরের গন্তব্যে।

‘আমরা এতদূর রিকশা চালিয়ে যাই। ভাড়া একটু বেশি না নিলে আমরা চলব কীভাবে?’

কিন্তু চালকের বাড়তি আয়ের প্রয়োজনীয়তার চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে যাত্রীর ওপর।

একটি যাত্রায় ৫০ কিংবা ১০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়তো কারও কাছে খুব বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন অফিস, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে যাতায়াত করা মানুষের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় মাস শেষে বড় অঙ্কে পরিণত হয়।

সংকট এখন অ্যাপের পর্দাতেও

সিএনজি অটোরিকশার বাইরে গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে অ্যাপভিত্তিক পরিবহনেও।

পাঠাও কিংবা উবারে যাত্রা বুক করতে গিয়ে আগের তুলনায় বেশি ভাড়া দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।

রামপুরা থেকে গাবতলী যাওয়ার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে কামাল হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের আগে যেখানে প্রায় ৩৫০ টাকার মধ্যে যাওয়া যেত, এখন সেখানে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেখাচ্ছে।

অবশ্য অ্যাপভিত্তিক পরিবহনের ভাড়া শুধু গ্যাসের দামের ওপর নির্ভর করে না। চাহিদা, গাড়ির প্রাপ্যতা, সময় ও যানজটসহ বিভিন্ন বিষয় এতে প্রভাব ফেলে। তবে রাস্তায় গাড়ির সরবরাহ কমে গেলে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বদলে গিয়ে যাত্রীর খরচ বাড়তে পারে। নগরবাসীর অভিজ্ঞতায় তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

গ্যাসের সংকট, নাকি সময়েরও সংকট?

ঢাকার সিএনজি স্টেশনগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর দিকে তাকালে সংকটটির আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়—এটি শুধু জ্বালানির সংকট নয়, সময়েরও সংকট।

একজন চালক যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেই সময়টুকু তিনি রাস্তায় আয় করতে পারছেন না। আয় কমলে তিনি বাড়তি ভাড়া চাইতে পারেন। বাড়তি ভাড়া দিলে যাত্রীর পরিবহন ব্যয় বাড়ে। আর সেই ব্যয় বাড়লে জীবনযাত্রার অন্য খাতেও তার প্রভাব পড়ে।

এইভাবেই একটি জ্বালানি সংকট ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে নগর অর্থনীতির আরও অনেক স্তরে।

সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে তাদের ওপর, যাদের প্রতিদিনের যাতায়াত থামানোর সুযোগ নেই।

সামনে আরও বড় চাপ?

ঢাকার মানুষ এমনিতেই যানজট, গণপরিবহনের সংকট ও বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে লড়াই করছে। এর মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবহন খাতে তার প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

সিএনজি চালকের আয় কমতে পারে, যাত্রীর ভাড়া বাড়তে পারে, অ্যাপভিত্তিক পরিবহনে চাহিদা বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়তে পারে পুরো নগর পরিবহনব্যবস্থার ওপর।

সমাধানের পথ তাই শুধু আরও গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন সরবরাহের পূর্বানুমানযোগ্যতা, স্টেশনভিত্তিক চাপ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং সংকটের সময়ে নগর পরিবহনব্যবস্থাকে সচল রাখার কার্যকর পরিকল্পনা।

কারণ ঢাকার রাস্তায় একটি সিএনজি অটোরিকশা কমে যাওয়া মানে শুধু একটি গাড়ি কমে যাওয়া নয়। কারও অফিসে পৌঁছাতে দেরি, কারও চিকিৎসকের কাছে যেতে বাড়তি অপেক্ষা, কারও দিনের আয় কমে যাওয়া-আর কারও মাসের বাজেটে যোগ হওয়া আরও একটি অপ্রত্যাশিত খরচ।

ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসের জন্য যে দীর্ঘ সারি, তার প্রভাব আসলে সেখানেই শেষ হয় না। সেই সারির অভিঘাত পৌঁছে যায় ঢাকার রাস্তায়, যাত্রীর পকেটে এবং চালকের সংসারে।

শেষ পর্যন্ত গ্যাসের লাইনে অপেক্ষা করছে শুধু গাড়ি নয়-অপেক্ষা করছে একটি শহরের স্বাভাবিক চলাচলও।
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement