জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণে সারাদেশে গ্যাস সংকট রূপ নিয়েছে তীব্র মানবিক ও অর্থনৈতিক ভোগান্তিতে। বাসাবাড়িতে মেটানো যাচ্ছে না মৌলিক চাহিদার রান্না, অন্যদিকে সিএনজি ও রাইড শেয়ারিং চালকদের রোজগার থমকে যাওয়ায় থমকে গেছে অনেকের জীবিকা।
পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর একটি বড় অংশ আসে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে—যেখান থেকে বিদেশ থেকে আনা এলএনজি রূপান্তর করে দিনে ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে গেছে। ফলে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২২০ কোটি ঘনফুটে। দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। আগে যেখানে চাহিদার তুলনায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি ছিল, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশে।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, ধানমন্ডি, মগবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবো, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত অধিকাংশ সময় চুলায় একফোঁটা গ্যাস থাকছে না। দুপুরের খাবারের জন্য মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে বহু পরিবারকে।
রাজধানীর বাইরেও পরিস্থিতি নাজুক। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে চাপ নেমে এসেছে শূন্যের কাছাকাছি। ফলে রাস্তার পাশের অধিকাংশ গ্যাস পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।
গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক রাখতে ন্যূনতম ১৫ পিএসআই প্রয়োজন হলেও পাম্পগুলোতে চাপ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৫ পিএসআই। এর ফলে সিএনজি অটোরিকশা ও ওবার চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না। এলপিজি সিলিন্ডারের সরবরাহেও টান পড়ায় রাইড শেয়ারিং ও ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালকরা ট্রিপ মারতে পারছেন না।
মিরপুরের এক সিএনজি অটোরিকশা চালক আমজাদ হোসেন (৪২) বলেন, গ্যাসের পাম্পে ৪-৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ফুল ট্যাংক গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গাড়ির মালিকের প্রতিদিনের জমা টাকাই উঠতেছে না, সিএনজি না চললে আমরা খাব কী? মালিকও টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে, আবার আমরাও আয় করতে পারছি না।
অন্যদিকে ভাড়ায় গাড়ি চালক ও ওবার চালক শহীদুল ইসলাম বলেন, আমার গাড়ি এলপিজিতে চলে, কিন্তু বাজারে গ্যাসের সিলিন্ডারও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। দু-একদিন ধরে ট্রিপ দিতে পারছি না। জমা বা কিস্তির টাকা শোধ করব কীভাবে, আর সংসারই বা কীভাবে চালাব—তা বুঝে উঠতে পারছি না।
গৃহস্থালির ভোগান্তি পৌঁছায় চরমে। পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় মানুষ এলপিজি সিলিন্ডার ও ইন্ডাকশন কুকারের ওপর ভরসা করতে চাইলেও বাজারে সিলিন্ডারের কৃত্রিম ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ওয়ারীর বাসিন্দা সীমা আক্তার বলেন, সকাল থেকে চুলা একদম ঠান্ডা। বাচ্চাদের স্কুলের টিফিন তো দূরের কথা, দুপুরের ভাতও বসাতে পারি নাই। গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে দেখি দোকানে সিলিন্ডার নাই, যেখানে পাইছি সেখানে অতিরিক্ত দাম চাচ্ছে। শেষমেশ হোটেল থেকে বাধ্য হয়ে খাবার কিনে আনতে হইছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রতিনিধি জানান, পর্যাপ্ত প্রেসার না থাকায় পাম্প চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এতে ব্যবসা বন্ধের পাশাপাশি প্রতিদিন হাজার হাজার পরিবহন চালক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রকৌশলীরা টার্মিনালের ত্রুটি মেরামতে কাজ করছেন। তবে আনুষঙ্গিক কারিগরি ও বীমা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে অন্তত আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লেগে যেতে পারে। ততদিন পর্যন্ত নাগরিক জীবনে এই ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এসএ