দেড়যুগ আন্দোলন-সংগ্রাম ও অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি। দীর্ঘ এ সংগ্রামে নেতাকর্মীর দিতে হয়েছে অনেক কাফফারা। অনেকে বরণ করেছেন পঙ্গুত্ব। আবার অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জন। আশা ছিলো ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে হয়ত অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। কিন্তু এ আশায় গুড়ে বালি, বলছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
বিশেষ করে মন্ত্রী পরিষদে স্থান পেয়ে অনেকে কাঠের চশমা পড়েছেন বলে অভিযোগ বিএনপি, যুবদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতার। বিশেষ করে ছাত্রদলের সাবেক এক শীর্ষনেতা মন্ত্রী পরিষদে স্থান পেয়ে এড়িয়ে চলছেন দলটির নেতাকর্মীদের। যুবদলের বর্তমান কমিটির এক কেন্দ্রীয় নেতা ডেইলি অবজারভারকে বলেন, নিজের একটি প্রয়োজনে সেই মন্ত্রীর কাছে গেলে তিনি আমাকে ভূগোল বুঝায়। শুধু তাই নয়, তার রুমে ঢুকলে সে যেনো আমাদের চিনেই না, এমন ভাব।
এসব বিষয়ে দলটির নেতারা বলছেন, যাদের এমপি মনোনয়নই অনিশ্চিত ছিলো তারা এখন মন্ত্রী হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। এছাড়া রাজপথের সাথে সম্পৃক্ত না থাকা অনেক নেতার মন্ত্রীত্ব পাওয়াকেও এসব বিষয়ে দায়ী করছেন অনেকে।
বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য ডেইলি অবজারভারকে বলেন, নির্বাচনের আগে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে অনেকে আমার অফিসে এসেছিলো। আজকে তাদের অনেকে আমার কলও রিসিভ করেন না। এমনকি ক্ষুদে ম্যাসেজ পাঠালে সিন করারও প্রয়োজন বোধ করেন না।
এদিকে দলটির নেতাকর্মীরা জানান, দলের যেসব ত্যাগী নেতা রয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন (ছাত্রদলের সাবেক শীর্ষনেতা) বাদে বিশেষ করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য বিদুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও মৎস ও পশুসম্পদ মন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সড়ক ও রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালামের দরজা নেতাকর্মীদের জন্য সবসময়ই উম্মুক্ত থাকে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী এবং মাহদী আমিনকেও প্রয়োজনে নাগালে পান, এমনটিই জানিয়েছেন নেতারা।
কল রিসিভ না করা প্রসঙ্গে এক মন্ত্রী ডেইলি অবজারভারকে বলেন, আমার মোবাইল নাম্বারটি সবাই জানে। তাই সে কমন নাম্বারটি আমার এপিএসের কাছে থাকে। আর আমি নতুন নাম্বার নিয়েছি।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ডেইলি অবজারভারকে বলেন, আমি সবসময়ই কল রিসিভ করার চেষ্টা করি। এছাড়া কোনো নেতাকর্মী বলতে পারবে না, আমি কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। বরং যারাই আমার কাছে এসেছে প্রত্যেকের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছি।
মনোনয়ন নিয়েই শঙ্কায় ছিলেন এমন অনেক নেতাই শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। অথচ যেসব আসনে তাদের বিপরীতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও শক্তিশালী দলীয় নেতারা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, তারা বঞ্চিত হয়েছেন। এদের মধ্যে শেখ রবিউল আলম রবির আসনে ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, সরদার সাখায়াত হোসেন বকুলের আসনে আব্দুল কাদের ভূঁইয়া, এহসানুল হক মিলনের আসনে মোশাররফ হোসেন, ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের আসনে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, ফারজানা শারমিন পুতুলের আসনে তাইফুল ইসলাম টিপু, মীর শাহে আলমের আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, রাজিব আহসানের এলাকায় সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, আহমেদ সোহেল মঞ্জুর আসনে মাহমুদ হোসেন, মীর হেলালের আসনে ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, শেখ ফরিদুল ইসলামের আসনে কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামীম এবং আব্দুল বারীর আসনে ওবায়দুর রহমান চন্দনের মতো ত্যাগী নেতারা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন।
দলীয় নেতাদের মতে, মনোনয়ন পাওয়াই যেখানে অনিশ্চিত ছিল, সেখান থেকে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাওয়া এসব নেতার অনেকেই এখন দলীয় ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন। এ নিয়ে দলের ভেতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষও বাড়ছে।
শুধু তাই নয়, কল না ধরার তালিকায় জোট নেতারাও পিছিয়ে নেই। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নূরুল হক নুর, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিকে কখনই টেলিফোনে বা সরাসরি দেখা করার সুযোগ পায় না বলে জানান নেতাকর্মীরা। তারা অন্যদল থেকে এমপি হওয়ায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও অনেকটা কোনঠাসা।
এ বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসী প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর ডেইলি অবজারভারকে বলেন, আমি নিয়মিত অফিস করি। হয়ত, অনেক সময় মোবাইল হাতে থাকে না, তাই কল রিসিভ করতে পারি না।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ডেইলি অবজারভারকে বলেন, লাখো লাখো নেতাকর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষার জন্যই আজ বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাদের অবদানের কথা ভুলে গেলে হবে না। তবে, রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় অনেক সময় কল ধরা হয়ে ওঠে না।
নেতাকর্মীরা বলছেন, যারা রাজপথে না থেকে মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন তাদের কাছে মূল্যায়ন পাওয়া আশা করাও ভুল। ঢাকার পাশ্ববর্তী এক জেলার এমপি নাম প্রকাশ করার না শর্তে ডেইলি অবজারভারকে বলেন, যারা মন্ত্রী হয়েছেন তাদের সিংহভাগের সাথে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে সম্পর্ক নেই। আমি নিজেও তাদের সম্পর্কে এতটা ওয়াকিবহাল নই।
একই অভিযোগ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল শীর্ষনেতাদের। যুবদলের এক শীর্ষনেতা ডেইলি অবজারভারকে বলেন, কয়েক মন্ত্রীর এমন ভাব যে আমরা তাদের কর্মচারী। কোনো দরকারে গেলে হাইকোর্ট দেখায়, অথচ সেই কাজটিই পরে মন্ত্রী তার নিকটজনকে দিয়ে দেন।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিএনপির একটি শক্তিশালী অঙ্গসংগঠনের সভাপতি ডেইলি অবজারভারের এই প্রতিবেদককে একটি জেলার সাংগঠনিক সম্পাদকের বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি জানান, ওই নেতার ভগ্নিপতিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওএসডি করা হয়েছিল। পরে তাকে কোনো একটি উপযুক্ত পদে পদায়নের জন্য একজন মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করা হলেও তিনি পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
মন্ত্রীসভার অনেক সদস্যকে নিয়ে আক্ষেপ করে দলটির নেতারা এই প্রতিবেদককে জানান, গণপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রী এবং বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের স্বত্বাধিকারী জাকারিয়া তাহের সুমন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশিত যোগাযোগ নেই।
এ ছাড়া কয়েকজন আঞ্চলিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রী হওয়ার পর তারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা ছাড়া অন্য এলাকার নেতাকর্মীদের তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ডেইলি অবজারভারকে বলেন, আসলে কাজের পরিধি বেড়ে গেছে। সকাল-বিকাল শত-শত লোক মন্ত্রীদের বাসায় যায়। সবসময় কল রিসিভ করতে পারে না।
এদিকে বাংলাদেশ সচিবালয়ে সরজমিনে দেখা যায়, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীগণ সিংহভাগ এপিএস কখনও বিএনপির রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না। যার কারণে দলের নেতাকর্মীরা কোন প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে গেলে সেখানে তারা প্রবেশই করতে দেন না।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানকে ঘিরে খোদ স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই তীব্র অসন্তোষ ও আক্ষেপ রয়েছে। সংগঠনটির একাধিক শীর্ষ নেতা দাবি করেন, অন্তত ২০টি জেলার শীর্ষ নেতারা গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হননি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতাকর্মীদের ফোন রিসিভ করেন না এবং সাংগঠনিক বিষয়ে যোগাযোগ থেকেও দূরে থাকেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “রাজিব আহসান মূলত একটি সিন্ডিকেটের বাইরে তেমন কোনো বিষয়ে আগ্রহ দেখান না। তিনি যাদের নিয়ে চলেন, সেই সিন্ডিকেটের সদস্য কারা- সেটিও সংগঠনের সবাই জানে।”
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ছাড়া কোনো বিষয়ে আমি মন্তব্য করবো না।
সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে ডেইলি অবজারভারকে বলেন, আমি সবসময়ই আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। আপনাকে কোনো নেতাকর্মী প্রয়োজনে আপনাকে রিচ করতে পারে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগটি সত্য নয়।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, প্রবাসী ও শ্রম মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সমাজকল্যান মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলমকে গতদিন একাধিকবার কল করলেও তারা রিসিভ করেননি।
সার্বিক বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রম উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন ডেইলি অবজারভারকে বলেন, ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে ৬০ লক্ষ নেতাকর্মী মামলায় জর্জরিত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে বিএনপির প্রায় ৫ শতাধিক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র পাঁচ মাস হলো। পর্যায়ক্রমে বিএনপির সকল ত্যাগী নেতাকর্মীই মূল্যায়িত হবেন ইনশাআল্লাহ।
-টিএস