রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা ঘটনা ও বক্তব্যকে ঘিরে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদ থেকে তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে অবসান হলো প্রায় সাড়ে তিন বছরের অধ্যায়ের। তবে তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময়জুড়ে তৈরি হওয়া নানা বিতর্ক এখনও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপতির পদটি সাংবিধানিকভাবে মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।
তবে এর কিছুদিন পরই তাঁকে ঘিরে শুরু হয় বড় ধরনের বিতর্ক। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর কাছে শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নেই। তিনি আরও দাবি করেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দেওয়ার সময় পাননি বলে তিনি শুনেছেন।
রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা জানিয়েছিলেন। ফলে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে, শেখ হাসিনা আসলেই পদত্যাগ করেছিলেন কি না।
এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতারা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করেন। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচিও পালন করা হয়। তবে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জন্য সংসদে অভিশংসন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হওয়ায় সে সময় তাঁকে সরানো সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের। চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে নতুন সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বিরোধী সদস্যরা তাঁর অতীত ভূমিকা এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করেন। একপর্যায়ে বিরোধী সদস্যরা ওয়াকআউটও করেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন জেলা ও দায়রা জজ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়েও নানা আলোচনা ছিল।
সবশেষে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিনের অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, তাঁর সময়কালের নানা রাজনৈতিক বিতর্ক দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচিত হতে পারে।
-টিএস