রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ তৈরির অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগ (ডিবি)। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, আব্দুল্লা আল-মামুন (৪২), মো. সাজু (৩৩) ও মো. সজীব (২৬)।
তাদের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ, প্যাকেজিং সামগ্রী এবং ওষুধ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এসব ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রাইব করা চিকিৎসকদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের সি ব্লকের একটি ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ওই তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।
তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সিরাপ, ক্যাপসুল, শ্যাম্পু, ফেসওয়াশ, হাইজিন ওয়াশ, সাবান, পাউডার ও ট্যাবলেটসহ বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ভেজাল ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত তিনটি সিলিন্ডার, একটি ফুয়েল লাগানোর মেশিন, দুটি ক্যাপসুল ভরার মেশিন, ১০ কেজি ফুয়েল (পলিথিন), ছয়টি ক্যাপসুল ভরার যন্ত্রাংশ এবং দুটি লেবেল লাগানোর সাঁচ জব্দ করা হয়েছে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, জব্দ সামগ্রীর মধ্যে শিশুদের ব্যবহারের কয়েকটি সিরাপ ও লিকুইড পণ্য রয়েছে। এসব ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ শিশুদের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যের বরাতে ডিবি প্রধান জানান, জব্দ কিছু ওষুধ দেশে প্রচলিত নয়। এসব ওষুধ প্রতিবেশী দেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসকের মাধ্যমে এসব ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রাইব করানো হতো।
অনুমোদনহীন ওষুধ চিকিৎসকদের মাধ্যমে প্রেসক্রাইব করা হতো কি না, জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো চিকিৎসকই ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদনহীন ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন না। তদন্তে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নাম পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, চক্রটি এ পর্যন্ত বাজারে কত টাকার ওষুধ সরবরাহ করেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযানে পাওয়া কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
জব্দ করা ওষুধের মধ্যে বিদেশি ওষুধও রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব ওষুধ দেশে বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
অভিযানে শিশুদের ব্যবহারের কিছু ওষুধও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কিডোকেয়ার নামে একটি সিরাপকে নকল হিসেবে উল্লেখ করেছেন ডিবির কর্মকর্তা। এ ছাড়া শিশুদের জন্য ব্যবহৃত কিড ওমেগা ও ভিটামিন ডি৩-সংক্রান্ত কিছু ওষুধও জব্দ করা হয়েছে।
ভেজাল ওষুধ সাধারণ মানুষ কীভাবে শনাক্ত করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির কর্মকর্তা বলেন, ভেজাল ওষুধ চেনা অত্যন্ত কঠিন। তবে ওষুধের মোড়ক ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্যাকেজিং ভালোভাবে দেখলে অনেক ক্ষেত্রে ভেজাল ওষুধ শনাক্ত করা সম্ভব।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মামলার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। চক্রটি কার কাছে ওষুধ বিক্রি করেছে, কোথায় কোথায় সরবরাহ করেছে এবং কোনো ডিসপেনসারি বা বিক্রয়কেন্দ্রে এসব ওষুধ রয়েছে কি না, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে এ ব্যবসা করার কথা জানিয়েছেন। যে বাসাটি ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল, সেটিও প্রায় তিন মাস আগে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল।
চক্রটির নেটওয়ার্ক সারা দেশে রয়েছে কি না, জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তাদের নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
টিআই